বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো পাঁচ মাস মোটামুটি শান্ত থাকলেও গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে সরকারকে বিপদে ফেলতে পারে।

বিএনপি সরকার গঠনের ছয় মাসও পূর্ণ হয়নি। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতিকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একের পর এক ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে বিরোধ, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, ধাক্কাধাক্কি, মারামারি, হলের সিট নিয়ে অভিযোগ, দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবারও রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
বিএনপি সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই একধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। গত মাসের শেষ দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কার্যক্রম ও উপস্থিতি ইস্যুকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই উত্তেজনা কাটতে না কাটতেই চলতি মাসের ১ তারিখে সমকামিতা-সংক্রান্ত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর রেশ না কাটতেই রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজাকারের ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
আজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কি ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে এ ধরনের উত্তেজনা ও সংঘাতের ঘটনা ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদ, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা নতুন ছাত্ররাজনীতির প্ল্যাটফর্ম এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠন।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে ক্যাম্পাসকে দলীয় আধিপত্য, হল দখল কিংবা ছাত্রসংগঠনের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই ক্যাম্পাসেই আবার নতুন করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে—ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে কি শুধু ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় বদলেছে, নাকি বদলেছে ছাত্ররাজনীতির সংস্কৃতিও?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, উত্তরটি এখনো স্পষ্ট নয়।

গত ৩ মার্চ ঢাকার ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের লতিফ হলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে বছরের শুরুতেই ক্যাম্পাস রাজনীতির উত্তেজনার একটি চিত্র সামনে আসে। হলকেন্দ্রিক বিরোধ থেকে তৈরি হওয়া সেই উত্তেজনা পরে ছড়িয়ে পড়ে আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আবাসিক হল বা ছাত্রাবাস বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে বরাবরই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ফলে হলের একটি সিট নিয়েও বিরোধ অনেক সময় বৃহত্তর সাংগঠনিক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়।
এর কিছুদিন পর এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতি ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি সেখানেই থেমে থাকেনি। এর প্রভাব পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেয়াল লিখন, গ্রাফিতি, রাজনৈতিক স্লোগান এবং ক্যাম্পাসে কোন সংগঠনের উপস্থিতি কতটা দৃশ্যমান হবে—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হতে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের দেয়ালে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক বক্তব্য ও গ্রাফিতি সেই উত্তেজনাকে আরও দৃশ্যমান করে। যে দেয়াল একসময় শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেটিই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র।
এখানেই বর্তমান ক্যাম্পাস রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চোখে পড়ে। বিরোধের কারণ এখন শুধু হলের সিট, মিছিল বা সাংগঠনিক আধিপত্য নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক মূল্যবোধ, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ব্যাখ্যা এবং কে কোন রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করবে—এসবও সংঘাতের কারণ হয়ে উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনাও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। কোনো একটি বক্তব্য, সামাজিক ইস্যু কিংবা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ দ্রুত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের বৃহত্তর রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে।
মে মাসে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—ডুয়েটে—উপাচার্যের যোগদানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও পরিস্থিতির আরেকটি দিক সামনে আনে। সেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিরোধ দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি সিদ্ধান্তও এখন আর কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে থাকছে না; তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান।
জুনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও হলের সিট দখল নিয়ে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদল। একই সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও দুই ছাত্রসংগঠনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়।
এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন প্রবণতা দেখা যায়। তা হলো—ক্যাম্পাসে কে কতটা সাংগঠনিকভাবে দৃশ্যমান, কে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য, কে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবে এবং কে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবে—এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে একটি নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

আর সেই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী এখন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। তবে দুই সংগঠনের শক্তির জায়গা এক নয়। ছাত্রদলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান। বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। ফলে ছাত্রদল সরাসরি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন। জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে তার সাংগঠনিক যোগাযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ক্ষমতার রাজনৈতিক সুবিধা—সবই তার শক্তির অংশ।
অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের শক্তি তৈরি হয়েছে ভিন্ন পথে। সাম্প্রতিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেলগুলোর সাফল্য তাদের একটি নতুন ধরনের বৈধতা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনী ফলাফলে শিবির-সমর্থিত বা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্যানেলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান দেখা গেছে।
এখানেই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি ও ক্যাম্পাস রাজনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। কিন্তু কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির শক্তি যতটা দৃশ্যমান, বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে সেই সমীকরণ ততটা সরল নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বর্তমানের রাজনৈতিক লড়াইয়ের জায়গা নয়। এখান থেকেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। যে সংগঠন ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে এবং ছাত্র সংসদে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় রাজনীতিতেও তার প্রভাব বাড়তে পারে।
এই কারণেই ছাত্রদল ও শিবিরের বর্তমান প্রতিযোগিতাকে শুধু ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ মেরুকরণেরও সম্পর্ক রয়েছে। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে—এই প্রতিযোগিতা কি গণতান্ত্রিক থাকবে?
কারণ প্রতিযোগিতা থাকা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। ছাত্রদল ও শিবির পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হবে, একে অপরের সমালোচনা করবে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যখন হলের সিট, ক্যাম্পাসে কর্মসূচি পালন, দেয়াল লিখন, অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করার দিকে যায়, তখন সেটি আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকে না। সেখান থেকেই জন্ম নেয় আধিপত্যের রাজনীতি। আর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আধিপত্যের রাজনীতির ভয়াবহ পরিণতি আগেও দেখেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়জুড়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস ও হল নিয়ন্ত্রণ, সিট বণ্টন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়া, বিরোধীদের ওপর হামলা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে ক্ষোভও ধীরে ধীরে জমা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।

তাই ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীদের বড় একটি প্রত্যাশা ছিল—ক্যাম্পাস আর কোনো রাজনৈতিক দলের দখলে থাকবে না। কিন্তু এখন যদি ছাত্রদলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠতে শুরু করে, তাহলে বিএনপির জন্য সেটি হবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়।
কারণ বিরোধীরা তখন খুব সহজেই একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারে—‘ছাত্রলীগের জায়গায় ছাত্রদল।’
এই বয়ান সত্য হোক বা অতিরঞ্জিত হোক, রাজনৈতিকভাবে এটি বিএনপির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের একটি ছোট ঘটনা পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
এখানে বিএনপির সামনে তাই একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা রয়েছে। তারা কি ছাত্রদলকে এমন একটি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, যারা ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা করবে, কিন্তু প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না; হলের নিয়ন্ত্রণ নেবে না; সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে না এবং প্রতিপক্ষ সংগঠনের রাজনৈতিক অধিকারকে সম্মান করবে?
নাকি ক্ষমতার স্বাভাবিক সুবিধা ব্যবহার করে ছাত্রদলও ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটবে?
উত্তরটি এখনো পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে শিবিরের জন্যও পরিস্থিতি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাফল্য তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি ও দলীয় ছাত্রসংগঠনের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি মনে করে ছাত্র সংসদও শেষ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে, তাহলে সেই নির্বাচনী বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এখানে নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তিরও উত্থান হচ্ছে—যারা সরাসরি ছাত্রদল বা শিবিরের রাজনীতির বাইরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চাইছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া বিভিন্ন ছাত্র প্ল্যাটফর্ম, নির্বাচিত ছাত্র সংসদ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাধীন উদ্যোগ সেই তৃতীয় জায়গাটি তৈরি করছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত দেয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কি ও মারামারি সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।
এখানে বিষয়টি শুধু ছাত্রদল বনাম শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং নতুন ছাত্ররাজনীতির শক্তিগুলোও এখন নিজেদের জায়গা দাবি করছে।
আর এই জায়গাটিই ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কারণ ছাত্রদল ও শিবিরের দ্বন্দ্ব যদি বাড়তে থাকে, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হয়তো দুই পক্ষের বাইরে তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে পারে। তারা বলতে পারে—কোনো দলীয় ছাত্রসংগঠন নয়, শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বই হবে ক্যাম্পাস রাজনীতির ভিত্তি।

এমন পরিস্থিতিতে ছাত্র সংসদগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কিন্তু বিপরীত চিত্রও সম্ভব। যদি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এবং তার বিপরীতে শিবিরও সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে পাল্টা আধিপত্যের পথে যায়, তাহলে ক্যাম্পাস আবারও সংঘাতের দিকে যেতে পারে।
হল হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র। দেয়াল লিখন হয়ে উঠতে পারে আধিপত্যের প্রতীক। একটি সেমিনার বা মিছিল হয়ে উঠতে পারে সংঘর্ষের কারণ। আর প্রশাসনের একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হতে পারে রাজনৈতিক অচলাবস্থা। তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ শিক্ষার্থী।
যে শিক্ষার্থী রাজনীতি করতে চায় না, সে হয়তো রাজনৈতিক পরিচয় দিতে বাধ্য হবে। যে শিক্ষার্থী কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নয়, তাকে কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য—শিক্ষা, গবেষণা ও মুক্ত বুদ্ধির চর্চা—সেটি ক্রমেই পেছনে চলে যাবে।
এই জায়গাতেই বর্তমান পরিস্থিতি একটি অশনিসংকেত হয়ে উঠছে।
কারণ সংঘাতের সংখ্যা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের ধরন। একটি বিচ্ছিন্ন মারামারি হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাই। কিন্তু যদি একই ধরনের ঘটনা একের পর এক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটতে থাকে, তাহলে সেটি আর বিচ্ছিন্ন থাকে না। তখন সেখানে একটি রাজনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
রাজশাহী থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে জগন্নাথ—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অন্তত সেই প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, ক্যাম্পাসের বর্তমান উত্তেজনা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে আগামী কয়েক মাসে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো, ছাত্রদল ও শিবির নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে নির্বাচনী ও সাংগঠনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখবে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে, বিতর্ক হবে, রাজনৈতিক কর্মসূচি হবে, কিন্তু সহিংসতা হবে না। এমন একটি পরিস্থিতি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
তৃতীয় সম্ভাবনাটি আরও গভীর। যদি দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘাত বাড়তে থাকে, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই আবার ‘দলীয় ছাত্ররাজনীতি বন্ধ’ করার দাবি জোরালো হতে পারে।
২০২৪ সালের আগে যে ক্ষোভ ছাত্রলীগের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিস্ফোরিত হয়েছিল, ভবিষ্যতে সেই ক্ষোভ কোনো একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো দলীয় ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধেও যেতে পারে।
সেটি হলে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে—ক্যাম্পাসের সমস্যা শুধু সংগঠন বদলে সমাধান করা যায় না; রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিএনপি সরকারের জন্য তাই আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার চাইলে একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে পারে—ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন হতে পারে, কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নয়। শিবির বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন হতে পারে, কিন্তু তাদেরও একই নিয়ম মানতে হবে। কোনো সংগঠনের পরিচয় সংঘাত বা সহিংসতার দায় থেকে তাকে মুক্তি দেবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও একইভাবে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। হলের সিট বণ্টন, ছাত্রকল্যাণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচি—কোনো ক্ষেত্রেই দলীয় প্রভাবের সুযোগ রাখা যাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ছাত্র সংসদকে কার্যকর করা।
কারণ দলীয় ছাত্রসংগঠন যদি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে আধিপত্যের ঝুঁকি বাড়বে। কিন্তু নির্বাচিত ছাত্র সংসদ যদি শিক্ষার্থীদের দাবি, অধিকার ও মতপ্রকাশের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে, তাহলে দলীয় ছাত্ররাজনীতির প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই ভারসাম্যের মধ্যে থাকবে।

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—ক্ষমতার পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটে। ক্যাম্পাস সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি।
কারণ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে একসময় ছাত্রলীগের স্লোগান ছিল, সেখানে এখন ছাত্রদল ও শিবিরের স্লোগান লেখা হচ্ছে—এটিকে পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বলা যাবে না।
প্রকৃত পরিবর্তন তখনই হবে, যখন কোনো শিক্ষার্থী তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হলের সিট হারাবে না, কোনো সংগঠনের কর্মসূচিতে যোগ না দেওয়ার কারণে হুমকির মুখে পড়বে না, কোনো শিক্ষক বা প্রশাসক দলীয় পরিচয়ের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন না এবং একজন সাধারণ শিক্ষার্থী কোনো পক্ষের সমর্থন ছাড়াই ক্যাম্পাসে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে। অন্যথায় ইতিহাস শুধু চরিত্র বদলাবে, গল্প বদলাবে না।
আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি, ছাত্রলীগের জায়গায় ছাত্রদল, আর প্রতিপক্ষ হিসেবে শিবির—এই সমীকরণ বদলালেই যদি ক্যাম্পাসের রাজনীতি একই থাকে, তাহলে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম বড় আকাঙ্ক্ষাই অপূর্ণ থেকে যাবে।
তাই বর্তমান ক্যাম্পাস উত্তেজনাকে শুধু কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা।
একটি অশনিসংকেত।
প্রশ্ন হলো—এই সংকেতকে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ছাত্রসংগঠনগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে?
কারণ এখনো সময় আছে।
সংঘাতকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে আনার সময় আছে। দলীয় আধিপত্যের পরিবর্তে ছাত্র প্রতিনিধিত্বকে শক্তিশালী করার সময় আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ২০২৪ সালের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আবারও নিরাপদ, মুক্ত ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাসে পরিণত করার সময় আছে।
কিন্তু সেই সুযোগটি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে আগামী দিনের ক্যাম্পাসে সংঘাত আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকবে না—তা হয়ে উঠতে পারে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার স্থায়ী বৈশিষ্ট্য।
Author