
সেই ইন্দিরা গান্ধীর জামানা থেকে আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ মিত্র। এই মিত্রতা বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের চেয়েও সুদৃঢ় ছিল। শেখ মুজিব পরিবারের সঙ্গে গান্ধী পরিবারের পারিবারিক বন্ধন ছিল। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরও আওয়ামী লীগ তা ধরে রেখেছিল।
কিন্তু দুই বছরে মোদীভক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আওয়ামী লীগকে বিজেপির শাখা সংগঠন মনে হয়। যেমন কোল্ড ওয়ার যুগে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো যতটা না নিজ দেশের ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল মস্কোর অনুগত। পারস্পরিক স্বার্থ ও কৌশলগত সম্পর্কের বদলে মালিক-চাকরের সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো নিজ নিজ দেশে চরম অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে এবং সোভিয়েতের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই বিলীন হয়ে যায়।
কংগ্রেস ও বিজেপির সম্পর্ক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে শত্রুতে পরিণত হলেও, শেখ হাসিনা কয়েক বছর আগেও দিল্লি সফরে মোদির পাশাপাশি সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতেন। জড়িয়ে ধরতেন। বিজেপির এতে অস্বস্তি থাকলেও প্রিয়াঙ্কাকেও উষ্ণ আলিঙ্গন করতেন। আওয়ামী লীগ নেতারা এই তো কয়েক বছর আগেও বিজেপির আমন্ত্রণে দিল্লি গিয়েও কংগ্রেসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ সেরে আসতেন।

ভারতের রাজনীতির খোঁজ নিয়মিত রাখেন, তাঁরা জানেন গত কয়েক বছরে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে। পণ্ডিত নেহরু বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে যাওয়ায় ইন্দিরা স্বৈরাচারী হয়েও পুরোটা ধ্বংস করতে পারেননি। ইন্দিরা যতই বদনাম থাকুক, পঁচাত্তরের মানবাধিকারবিরোধী জরুরি অবস্থার পর ১৯৭৭ সালে তাঁর অধীনেই মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল, যাতে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকে নির্বাচনকে প্রশ্নমুক্ত করেছিলেন কড়া হেডমাস্টারের মতো ক্ষ্যাপাটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি. এন. সেশন।
ভারতের কয়েক বছর আগেও বিরোধী দলগুলো বলত, "পুলিশ দিয়ে তদন্ত নিরপেক্ষ হবে না। সিবিআই তদন্ত চাই।" এখনও সিনেমায় দেখবেন, সিবিআই মানেই বিরাট কিছু। সবাই ভয় পায়। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪—অটল বিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন বিজেপির প্রথম সরকারেও সিবিআই নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। ২০১৪ সালের আগে সিবিআই যদি তদন্ত করে কাউকে চোর সাব্যস্ত করত, তাহলে আদালতের রায়ের আগেই ওই ব্যক্তি সমাজের চোখে চোর হয়ে যেত। সিবিআইয়ের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করত না।
মোদি জামানায় প্রতিষ্ঠান দখল শুরু হয়। এখন সিবিআই, ইডি মানেই বিরোধী দলকে দমনের হাতিয়ার। সিবিআই তদন্ত করলে লোকে সেটা তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান করে। আর করবেই না কেন? গত ১০ বছরে অন্তত ১০০টি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে সিবিআই বিরোধী দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর পর সেই নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। সিবিআই তদন্ত বন্ধ হয়ে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের এখনকার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এর উদাহরণ। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা লাফিয়ে লাফিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিভিন্ন দল থেকে রানিং ১৭৩ জন এমপি ও বিধায়ক বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এই সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। কয়েকদিন আগে যেভাবে তৃণমূল কংগ্রেস ভাঙা হয়েছে, এর আগে শিবসেনার দুই দফা ভাঙন, এনসিপির ভাঙন ধরলে সংখ্যাটি ৬০০ ছাড়াবে।
কেন এত এত এমপি-বিধায়ক দল বদল করলেন? দুটি কারণ—মামলার ভয় এবং নগদ টাকা। ভারতে আগেও দল বদল ছিল। কিন্তু কাজটি লোকলজ্জায় গোপনে গোপনে হতো। এখন এটাকে উৎসব করে করা হয় ‘অপারেশন লোটাস’ নামে। বিজেপির জয় হিসেবে দেখানো হয় এই অনৈতিক কাজকে।
দল ভাঙা, নেতা ভাগিয়ে নেওয়ার পরও বিজেপি ছাড়ে না বিরোধী দলগুলোকে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় মিডিয়া, আদালত ও নির্বাচন কমিশন। গদি মিডিয়া ২৪ ঘণ্টা বিজেপির পক্ষে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালায়। সারাদিন মুসলিমদের ভিলেন বানিয়ে খবর প্রচার করে। টকশোর নামে যা-তা ঘৃণা ছড়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মিডিয়া যতই খারাপ হোক, এগুলো এখানে অকল্পনীয়। বিজেপির নেতারা সারাদিন বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন ও মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য দেন। বাংলাদেশে এর ১ শতাংশ বললেও, সে আর রাজনীতি করতে পারবে না। ভোটার সমাজ ওই গাধাকে আর গ্রহণ করবে না।
বিজেপির হয়ে দ্বিতীয় ধাপে কাজ করে নির্বাচন কমিশন। গত দুই বছর ধরে প্রত্যেকটি রাজ্যের নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানা বদলে দিয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে মুসলিম এবং বিরোধী দলের সমর্থকদের বাদ দিয়েছে বিজেপির অঙ্গসংগঠনে পরিণত হওয়া নির্বাচন কমিশন। আদালতে গিয়ে লাভ হচ্ছে না।
কর্নাটক ও হরিয়ানায় লাখ লাখ ভুয়া ভোটার এবং বিজেপি কর্মীদের একাধিকবার ভোটার হওয়ার তথ্য হাতেনাতে ধরা পড়লেও নির্বাচন কমিশন ও আদালত কিছুই করছে না। এরপরও যদি বিরোধীরা জিতে যায়, তাহলে বিজেপি সেই সরকারের পতন ঘটাচ্ছে বিধায়কদের নিজ দলে ভিড়িয়ে। যেমনটা মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটকসহ কয়েকটি রাজ্যে গত পাঁচ-সাত বছরে ঘটিয়েছে।
এগুলোতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কংগ্রেস। বিজেপি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে জানের দুশমনে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগের সেই বিজেপির অঙ্গসংগঠনের মতো আচরণ দলটির কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে, তা কংগ্রেস কখনও ক্ষমতায় ফিরলে বোঝা যাবে। তবে আগের সুসম্পর্ক আর থাকার কথা নয়।
এবারের দিল্লির জেনজি প্রোটেস্টে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ভারত ও বাংলাদেশে বসে বিজেপির পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করছে। দিল্লির আন্দোলনকে বিজেপির ভাষায় ‘ডিপ স্টেট’-এর কাজ হিসেবে দেখিয়ে ডিসক্রেডিট করছে।
এবারের আন্দোলনটাই কংগ্রেসের জন্য শেষ সুযোগ। কারণ বিজেপি যদি আগামী বছরের উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন কোনোভাবে জিতে, সমাজবাদী পার্টি ভেঙে ফেলে, তাহলেই সংসদের আসন বৃদ্ধির সংবিধান সংশোধনীটি পাস করাতে পারে। এটা ঘটলেই নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কংগ্রেসের ক্ষমতায় যাওয়ার আশা শেষ।
এই পরিস্থিতিতে দিল্লির আন্দোলনটা কংগ্রেসের জন্য আশা-আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছে। এই প্রথম ভারতের আমজনতা তীব্রভাবে বিজেপিবিরোধী হয়ে উঠেছে। বাচ্চারা পর্যন্ত মোদিকে যা খুশি গালাগাল করছে, যে মোদি কিছুদিন আগেও পূজনীয় ছিলেন। এই অবস্থায় বিজেপিকে সমর্থন দেওয়া কংগ্রেসের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা সময় বলবে।
বাংলাদেশ ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের কারণে এমনিতেই বিজেপি বাংলাদেশে ব্যাপক অজনপ্রিয়। তো এই রকম একটি দলের তাবেদারি করে আওয়ামী লীগ কী অর্জন করবে, নিশ্চিত নই। বরং বাংলাদেশে তার সমর্থন আরও কমবে।
বিজেপি যেহেতু কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির ইস্যুতে অভূতপূর্ব চাপে পড়েছে, তাই আগামী নির্বাচনগুলোতে জিততে ধর্মকে অপব্যবহার করতে হবে। এক ছাতার নিচে আনতে হিন্দু ভোটারদের অস্তিত্বের ভয় দেখাতে মুসলিমবিদ্বেষী ভাষণ দিতে হবে। মুসলিম নিপীড়ন করতে হবে। বাংলাদেশবিরোধী ঘৃণা ছড়াতে হবে, ভারতীয় হিন্দুত্ববাদকে উসকে দিতে।
এগুলো বিজেপিকে ভারতে ভোট দিলেও বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া হবে। বিজেপিকে তো বাংলাদেশের মানুষ হাতের কাছে পাবে না। তাদের ক্ষোভটা গিয়ে পড়বে বিজেপির পোষ্য হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের ওপর।
আওয়ামী লীগ কী এটা বুঝেশুনেই মোদিকে নমস্য বানিয়েছে?
Author