
শনিবার গুলিস্তানে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। মূলত চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এটি ঘটে। এটা অবশ্য বড় কোনো ঘটনা নয়। বিচ্ছিন্নই বলা যায়।
কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কটা এখন আসলে কেমন? এটি রাজনীতিতে একটি বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর খুঁজতে গিয়ে সার্বিক পরিস্থিতির ওপর একবার নজর দিতে পারি।
ইতিহাসের দিকে তাকাই। ভারতবর্ষে প্রায় নব্বই বছর আগে জামায়াতের জন্ম। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ—তিন দেশেই জামায়াত নামে দল রয়েছে। কিন্তু আদর্শিকভাবে জামায়াতের কাছাকাছি দল রয়েছে দুনিয়ার বহু দেশেই। ইখওয়ানুল মুসলেমিন, হাসান বান্না, সাইয়েদ কুতুব, জামায়াত সম্পর্কে জানতে হলে এসবও মনে রাখতে হবে আমাদের।
পলিটিক্যাল ইসলাম সারা দুনিয়াতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রচলিত ইবাদতে বলতে গেলে কারওই সমস্যা নেই। কিন্তু যখনই ক্ষমতার ভাগ চাওয়া হয়েছে, তখনই তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া।
বাংলাদেশে জামায়াতের ক্ষেত্রে ১৯৭১ তৈরি করেছে বাড়তি মাত্রা। দল হিসেবেই জামায়াত স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। এ ইস্যুর ফয়সালা তারা এখনও তৈরি করতে পারেনি। ৯০ আর ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে অবশ্য জামায়াতের গৌরবময় অংশগ্রহণ ছিল।
শেখ হাসিনা জামায়াতকে রাজনৈতিক দল হিসেবে ট্রিট করেননি। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সবারই ফাঁসি হয়। ব্যতিক্রম ছিলেন গোলাম আযম ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। তাঁদেরও অবশ্য সাজা হয়। মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। ১০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারান সংঘাতে। পরে আপিলে তাঁর সাজা কমে। গোলাম আযমের ব্যাপারে সৌদি রাজপরিবারের বিশেষ অনুরোধের কথা শোনা যায়।
পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন
সকালটা অন্য দশটা সকালের মতো ছিল না। গণভবনে নানামুখী দেনদরবার চলছিল। কিন্তু রাজপথ এবং পর্দার আড়ালের ব্যক্তিরা নিশ্চিত ছিলেন, শেখ হাসিনাকে চলে যেতে হবে। আন্দোলনকারীদের কাছে বার্তা ছিল, যেকোনো মূল্যে রাজপথে নামতে হবে। বাকিটা আমরা সম্পন্ন করব।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে যখন দিল্লিগামী বিমান ধরতে তাড়া দেওয়া হচ্ছিল, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তখনও ছিলেন আত্মগোপনে। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি তখনও নিষিদ্ধ। কিন্তু দিনের প্রথমভাগেই ক্যান্টনমেন্টে ডাক পড়ে ডাক্তারের। যদিও তাঁর সংযোগ পেতে বেগ পোহাতে হয়। তিনিও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সেখানে পৌঁছান। এক লহমায় লাইমলাইটে চলে আসে জামায়াত। নতুন সরকার গঠনেও দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষত সমন্বয়কদের একটি বড় অংশের কোনো না কোনোভাবে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকাও জামায়াতকে সুবিধা দেয়।
আলোচনা-সমালোচনা আছে। কিন্তু নির্বাচনেও জামায়াত অভাবনীয় ফল করে। দলটি তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করে এখন বিরোধীদলের আসনে রয়েছে। যদিও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। এজন্য কয়েকজন উপদেষ্টাকে দায়ী মনে করে জামায়াত।
বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক এখন কেমন?
ক্ষমতায় বিএনপি। বিরোধীদলের আসনে জামায়াত। দল দুটির সম্পর্ক এখন কেমন?
বাংলাদেশের ইতিহাস নানা কিসিমের বিরোধীদল দেখেছে। বিশেষ করে গৃহপালিত বিরোধীদলের ধারণাটা একদমই এ ভূখণ্ডের নিজস্ব। শেখ হাসিনার জমানায় যে ভূমিকায় আমরা দেখেছি জাতীয় পার্টিকে। জামায়াতকেও কেউ কেউ এখন গৃহপালিত বিরোধী দল বলে থাকে।
কিন্তু এ নিবন্ধের লেখকের বিশ্লেষণ হচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কটা এখন তেমন নয়। বরং দুই দলেরই স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে যেমন দ্বন্দ্ব রয়েছে, তেমনি আবার সখ্যতাও রয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ কেউ মনে করেন, জামায়াত যে ইসলামী দল নয়, সেটা বারবার সামনে নিয়ে আসতে হবে। জামায়াতের অর্থনৈতিক ভিত্তিও দুর্বল করে দিতে হবে। এ কারণেই নির্বাচনের আগে জামায়াতের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ইসলামী ব্যাংক, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠান নিয়ে দ্বন্দ্বের নেপথ্যেও একই কারণ রয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতের আইডিয়া হচ্ছে, বিএনপি তার মেয়াদ পূরণ করুক। এ সময়ে তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজেদের কাজ এগিয়ে নেবে। এবং আগামী নির্বাচনে শক্ত লড়াই করবে।
এই পরিস্থিতিতে, বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে মাঝে মাঝে উত্তেজনা তৈরি হলেও তা তীব্র হয়নি এখনও। কাছাকাছি সময়ে তা তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাও কম। যদিও দল দুটির কিছু অংশ তীব্র পরস্পরবিরোধী, বিশেষত অনলাইন অ্যাকটিভিস্টরা।
বিএনপি ও জামায়াতের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দল দুটির শীর্ষ নেতারা এটা জানেন, তাঁদের রেডলাইন কোথায়? আওয়ামী লীগকে না ফেরানোর ব্যাপারে এখনও তাঁরা একমত।
বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতার কারণেও সম্পর্কে উত্তেজনা কম বলে তাঁরা মনে করেন। যদিও কখনও কখনও তাঁরা পরস্পরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন।
জামায়াতের শীর্ষ এক নেতা পলিসি পেপারের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, উত্তেজনাকর বক্তব্য কিংবা সংঘাতে বিএনপির লোকসানই যে সবচেয়ে বেশি, সে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ফিরে দেখা
মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করে দেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একরকম গুপ্ত সমঝোতা ছিল। পরে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে।
কিছু বছর পর অবশ্য বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে জামায়াত। কেয়ারটেকার সরকার ইস্যুতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্য দেখা যায় জামায়াতের। এক বছর পর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।
পরে বিএনপি-জামায়াতের যে জোট গড়ে ওঠে, তা জীবিত ছিল প্রায় দুই দশক।
প্রেডিকশন
দ্রুতই বিএনপি-জামায়াতের মুখোমুখি অবস্থানে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে সময় যত গড়াবে, দল দুটির মধ্যে তিক্ততা এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে।
Author