ভারত–চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা

বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ভারত ও চীনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যে দেশটি কীভাবে নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মধ্যে নেই। বরং উত্তর নিহিত রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে, যেখানে জাতীয় স্বার্থই হবে প্রধান নির্দেশক।
পলিসি পেপারের মূল যুক্তি হলো—বাংলাদেশের উচিত "Strategic Multi-Alignment" বা "কৌশলগত বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব" নীতি অনুসরণ করা। অর্থাৎ ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রেখে অর্থনৈতিক সুযোগ সর্বাধিক করা এবং কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলা।
১. নতুন ভূরাজনীতির কেন্দ্রে বাংলাদেশ
গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে।
কিন্তু অর্থনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ বর্তমানে তিনটি বৃহৎ
কৌশলগত বাস্তবতার মিলনবিন্দুঃ
প্রথমত, ভারতের “Act East Policy”;
দ্বিতীয়ত, চীনের “Belt and Road Initiative (BRI)”;
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের “Indo-Pacific Strategy”।
এই তিনটি বৃহৎ কৌশলগত প্রকল্পের প্রতিটিতেই বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের কাছে বাংলাদেশ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার।
চীনের কাছে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার।
ফলে বাংলাদেশ আর শুধু একটি দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র নয়; এটি এখন বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার।
২. ভারত: ভৌগোলিক বাস্তবতা ও কৌশলগত অপরিহার্যতাঃ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের গুরুত্ব কোনো কূটনৈতিক পছন্দের বিষয় নয়; এটি একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশের প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত ভারতের সঙ্গে।
দুই দেশের মধ্যে রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক।
বাংলাদেশের স্থলবাণিজ্যের বড় অংশ ভারতীয় করিডর ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।
বর্তমানে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার, জ্বালানি সরবরাহকারী এবং নিরাপত্তা সহযোগী।
নিরাপত্তা সহযোগিতাঃ
২০০৯ সালের পর থেকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন মাত্রা লাভ করে।
বাংলাদেশ তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে।
ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে।
ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ সরকারের এই সহযোগিতা উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে সীমান্ত অপরাধ, মানবপাচার, জঙ্গিবাদ ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে উভয় দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
যোগাযোগ ও সংযোগঃ
বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের “Act East Policy”-এর কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত হয়েছে।
আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ নৌপথ এবং সড়ক যোগাযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করছে।
ভারতের জন্য এটি পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ।
বাংলাদেশের জন্য এটি ট্রানজিট রাজস্ব, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হওয়ার সম্ভাবনা।
অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জঃ
তবে সম্পর্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনার পরও এই সমস্যার সমাধান হয়নি।
এছাড়া সীমান্তে প্রাণহানি, অশুল্ক বাধা এবং ভারতীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য বাংলাদেশের জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে হলে এসব ইস্যুর রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
৩. চীন: অর্থনৈতিক সুযোগ ও কৌশলগত ভারসাম্যের নতুন মাত্রা
গত এক দশকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনের ভূমিকা দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ।
কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল, সড়ক ও রেল উন্নয়নসহ একাধিক বৃহৎ প্রকল্পে চীনা অংশগ্রহণ রয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি অর্থনীতি।
বেইজিং বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বৃহত্তর BRI কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
কেন চীন গুরুত্বপূর্ণ?
চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দ্রুত বাস্তবায়ন সক্ষমতা।
পশ্চিমা অর্থায়ন যেখানে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোয়, সেখানে চীনা প্রকল্প তুলনামূলক দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চীনা বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্ভাব্য ঝুঁকিঃ
তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি কৌশলগত ঝুঁকিও রয়েছে।
প্রথমত, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা।
দ্বিতীয়ত, ঋণনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়নের ঝুঁকি।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত ও শিল্প নির্ভরতার সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের উচিত অর্থনৈতিক লাভ সর্বাধিক করা, কিন্তু এমন কোনো অবস্থায় না যাওয়া যেখানে একটি মাত্র রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়।
৪. বঙ্গোপসাগর: ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির কেন্দ্র
আগামী দুই দশকে বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারত মহাসাগর হয়ে প্রবাহিত হয়।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবস্থান তাকে এই নতুন ভূঅর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।
চট্টগ্রাম, মোংলা, মাতারবাড়ী এবং পায়রা বন্দর ভবিষ্যতে শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র অঞ্চলের বাণিজ্য কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে।
যদি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়, তবে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর বা দুবাইয়ের মতো একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
৫. ২০৩০–২০৪১: বাংলাদেশের জন্য নীতিগত রোডম্যাপ
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে।
ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতাকে সংঘাত হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—
১. অর্থনৈতিক কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে আনা
প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
২. ভারতের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক পুনর্গঠন
তিস্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের প্রশ্নে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে।
৩. চীনের সঙ্গে স্বচ্ছ ও টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব
প্রকল্পভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
৪. বঙ্গোপসাগরভিত্তিক ব্লু ইকোনমি উন্নয়ন
সমুদ্রসম্পদ, বন্দর, জাহাজ নির্মাণ এবং সামুদ্রিক জ্বালানি খাতকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ করতে হবে।
৫. কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা
বাংলাদেশকে কোনো সামরিক জোটে জড়িয়ে না পড়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভারত বা চীন—কিছুই নয়।
প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে এই দুই শক্তির মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করা যায়।
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের শেষে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতি হবে ভারসাম্যপূর্ণ বহুমাত্রিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সমন্বয়।
যদি বাংলাদেশ এই পথ অনুসরণ করতে পারে, তবে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশটি শুধু একটি উন্নত অর্থনীতিতেই পরিণত হবে না; বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি প্রভাবশালী ভূকৌশলগত শক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করবে।

Author