
জুলাই ২০২৪-এর বিপ্লব-পরবর্তি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখনও সুস্পষ্ট রূপ লাভ করেনি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচন ও একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু নির্বাচিত রাজনৈতিক পক্ষগুলো এখও তারা মোটামুটিভাবে যে সংস্কারগুলোর বিষয়ে একমত হয়েছিল, সেগুলো কীভাবে এবং কখন বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক চায়িয়ে যাচ্ছে। এদিকে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তিগুলোও পুররায় প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করছে।
শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনশৈলী থেকে আইনের শাসনভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চলমান রাজনৈতিক উত্তরণ এখনও সম্পূর্ণ হওয়া থেকে অনেক দূরে। তাহলে কি আমরা বর্তমান এই উত্তরণের সমাপ্তির অপেক্ষায় আছি, নাকি জাতির রাজনৈতিক অভিযাত্রায় আরেকটি পরিবর্তনের? তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পরবর্তী উত্তরণটি কবে ঘটবে তা নয়; বরং দুই বছর আগে সংঘটিত উত্তরণ থেকে আমরা কী শিক্ষা অর্জন করেছি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কেবল দেশের অধিকাংশ প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির কাছেই অপ্রত্যাশিত নয়, বরং এটি ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অসাধারণ ঘটনা। ফলে, রাজনৈতিক কাঠামোকে পুনর্নির্ধারণ এবং জনগণবিরোধী, মাফিয়াধাঁচের শাসনের অবশিষ্ট প্রভাব দূর করে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে চলমান উত্তরণকে পরিচালিত করার জন্য তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না।
প্রকৃতপক্ষে, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান গত আট দশকে পর্যবেক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিষ্ঠিত ধারার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশে প্রায় প্রতি দুই দশক অন্তর অন্তর একটি করে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৪৭ সালে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ২৪ বছর পর, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিভক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর প্রায় দুই দশক পর, ১৯৯০ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করে।
১৯৯১ সালে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ওয়েস্টমিনস্টারধারার সংসদীয় গণতন্ত্র ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির সেনাসমর্থিত ক্ষমতা দখলের পর দুই বছরের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার ফলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত তিনটি নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় বহাল থাকেন; এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি ভারতে পালিয়ে যান।
এর মধ্যবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গতিপথের সংশোধনও ঘটেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ দ্বারা চিহ্নিত ছিল এবং ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ভেঙে ফেলা হয়।
ওই বছরের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হলে তাঁর শাসনের অবসান ঘটে। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানও ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।
জেনারেল এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত বিএনপি রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করেন এবং বল প্রয়োগ নির্ভর শাসনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হলেও, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সহিংস আন্দোলনের মুখে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার পর ১৯৯৬ সালে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা আবার খালেদা জিয়ার কাছে পরাজিত হন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি এবং বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মধ্যে সাম্প্রতিক বিতর্কে কিছু হতাশ পর্যবেক্ষক আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু তারা যে বিষয়টি উপেক্ষা করছেন, তা হলো—শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের অনুসরণকারী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতির প্রত্যাখ্যান বৃহত্তর পরিসরে কেন্দ্র-ডানমুখী রাজনৈতিক ধারার দিকে এক মৌলিক পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করে।
২০২৬ সালের নির্বাচন দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক মূলধারার উত্থান এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ ঐতিহাসিকভাবে বামঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়াকে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে। শেখ হাসিনার দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের আগে, ডানপন্থী দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ—এই দুই দলই তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন লাভ করত।
তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে পরিচালিত জরিপগুলোতে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার বিএনপি ও জামায়াত-প্রধান আওয়ামী লীগবিরোধী জোটের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।
একসময় শেখ হাসিনা পরিকল্পিতভাবে বিরোধী দলকে দমন করে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই শাসনের অবসান ঘটাতে জনগণকে সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে এক হাজার পাঁচ শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হন।
এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তর। ১৯১৭ সালের রাশিয়া, ১৯৪৯ সালের চীন এবং ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবের বিপরীতে, কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির নেতৃত্ব ছাড়াই শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তবুও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কোনো বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়নি।
বরং মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী প্রশাসন একটি সংস্কার এজেন্ডাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জুলাই সনদে প্রতিফলিত আকাঙ্ক্ষাগুলো ক্রমশ রাজনৈতিক বক্তৃতা ও বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠায়, ২০২৪ সালের বিপ্লব এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
এটিও স্পষ্ট নয় যে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর—বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের—আকাঙ্ক্ষা অনুধাবন করতে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের ও দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সক্ষম কি না।
বিপ্লবের স্মৃতি এখনও তাদের মনে জীবন্ত, এবং তাদের অনেকেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিজয় মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের আকাঙ্ক্ষা যদি পূরণ না হয়, তবে তারা আবারও আরেকটি রাজনৈতিক উত্তরণের সূচনা করার উদ্যোগ নিতে পারেন। সিদ্ধান্ত এখনও রাজনীতিকদের হাতেই রয়েছে।
(দ্য ডেইলি ওয়াদা' পত্রিকায় প্রকাশিত মতামত কলামটি পলিসি পেপারের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করে দেয়া হলো।)
লেখক: খাজা মঈন উদ্দিন, সাংবাদিক।
Author