
সম্প্রতি দুই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের জুনে ঢাকা সফর ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের আজ তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফিরেন। এই দুই সফরই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেবল অস্ত্র কেনাবেচার বাইরে নিয়ে গিয়ে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করেছে।
দুই দেশ প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনে সম্মত হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক '২+২' পরামর্শ বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে উভয় দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা অংশ নেবেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তুরস্ক থেকে ১৫ ধরনের অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে: বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন: ২০২২ সালে চুক্তি স্বাক্ষরিত; ১২টি ইউএভির মধ্যে ৬টি সক্রিয় রয়েছে। টিআরজি-৩০০ কাপলান রকেট সিস্টেম: প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সংগ্রহ; বর্তমানে ১৮টি লঞ্চার। কোবরা সাঁজোয়া পার্সোনেল ক্যারিয়ার, মাইন-সুরক্ষিত যান, গ্রাউন্ড সার্ভেইলেন্স রাডার।
তবে এবারের আলোচনার মূল বিষয় ছিল ’বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জামের যৌথ উৎপাদন’। বাংলাদেশে তুরস্ক তাদের দেশে ড্রোন, ট্যাংক ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম উৎপাদন কারখানা স্থাপন তৈরী করা নিয়ে আলোচনা চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এই সম্পর্কের মূল্য কেবল অস্ত্র সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের একটি ভালো উদ্দ্যোগ।
ইতিমধ্যে ৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশি প্রতিরক্ষা কর্মী তুরস্কে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে গোলাবারুদ উৎপাদনে তুরস্ক প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জন্য পেট্রোল বোট নির্মাণে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য সম্পর্কও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দেশ বর্তমান ১.৩৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এ লক্ষ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে, পাশাপাশি তুরস্ককে ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের এই নতুন মাত্রা দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান পরিষ্কার: এটি ভারত-বিরোধী পদক্ষেপ নয়, বরং কৌশলগত বৈচিত্র্যকরণের অংশ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, "সামরিক কেনাকাটার উৎস বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য ভালো বিকল্প। চীনা অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পশ্চিমা অস্ত্রের উচ্চ মূল্যের বিকল্প খোঁজার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।"
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলামের মতে, "তুরস্কের ড্রোন ও ট্যাংকের সক্ষমতা এখন প্রমাণিত এবং খরচ কম কিন্তু সক্ষমতা বেশি। তুরস্ক চায় বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জামের যৌথ উৎপাদনে এগিয়ে আসতে, যা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উপকারী হবে।"
যদিও বাংলাদেশ-তুরস্ক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অভূতপূর্ব ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে এ পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। বাংলাদেশ বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলা করছে, যা বড় অঙ্কের সামরিক ব্যয়কে অভ্যন্তরীণ মহলে সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত আর্থিক বিনিয়োগ—যার সবকটিই বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে অর্জন করা একটি জটিল প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ-তুরস্ক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ধীরে ধীরে একটি নিছক ক্রয়-বিক্রয়ের সম্পর্ক অতিক্রম করে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হচ্ছে, যেখানে যৌথ কমিটি ও '২+২' বৈঠকের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এই সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুসংহত করবে; যদিও যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য এখনও বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও আলোচনার গতি ও উভয় পক্ষের রাজনৈতিক ইচ্ছা ইঙ্গিত দেয় যে এটি নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব হতে পারে—এবং এই সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান বিকাশই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে আর নিষ্ক্রিয় থাকবে না, বরং নিজের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়।
Author