
অপারেশন থিয়েটারের দরজা তখন তার সামনে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন কয়েকটি মুহূর্তের একটি হয়তো তখনই পার করছিল আলিফ। বাইরে স্বজনেরা নেই, মা-বাবা নেই। এমনকি পাশে দাঁড়িয়ে তার হাত শক্ত করে ধরে বলার মতো আপনজনও নেই—‘ভয় পেয়ো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
অপারেশনের আগে চিকিৎসকদের প্রয়োজন ছিল সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর। সেই কাগজে লেখা ছিল এমন একটি বাক্য, যা যে কোনো মানুষের মন দুর্বল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট—বাম চোখে গুরুতর আঘাত রয়েছে, অস্ত্রোপচারের পর দৃষ্টিশক্তি হারানোর সম্ভাবনা আছে।
প্রশ্ন ছিল সরল, কিন্তু উত্তর দেওয়া ছিল কঠিন—এই ঝুঁকি জেনেও সে কি অস্ত্রোপচারে রাজি?
আলিফের মা-বাবা কেউ সেখানে ছিলেন না। তাই বন্ডে স্বাক্ষর করার জন্য অন্য কারও অপেক্ষাও করা সম্ভব ছিল না। নিজেই নিজের অভিভাবক হয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল তাকে।
কাগজটি তার সামনে দেওয়া হলো।
তখনও আলিফ জানত না, তার বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
আমি ভয় পাচ্ছিলাম—এই কথাটি জানার পর যদি তার মন দুর্বল হয়ে যায়? যদি অপারেশনের আগে ভয় তাকে গ্রাস করে? যদি সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে?
কিন্তু আইন ও চিকিৎসার নিয়মের জায়গায় আবেগের কোনো সুযোগ নেই। রোগীর নিজের শরীর সম্পর্কে সত্য জানার অধিকার আছে। ঝুঁকি জেনেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তাই আলিফকে জানানো হলো।
কথাটা শোনার পরও তার মুখে আতঙ্কের কোনো ছাপ দেখা গেল না।
সে শুধু বলল—
‘কোথায় সই করতে হবে? দেন।’
তারপর আরও একটি বাক্য—
‘আমি ভয় পাচ্ছি না।’
এই ছোট্ট বাক্যটির মধ্যে যেন লুকিয়ে ছিল পাহাড়সম সাহস।
অপারেশন থিয়েটারের দিকে যাওয়ার আগে তার আরেকটি কথা ছিল। হাসনাত, আসিফ ভাইসহ যারা তার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলেন, তাদের উদ্দেশে সে বলল—‘অপারেশনের পর দেখা করতে বইলেন, যাতে ভালোভাবে দেখতে পাই।’
কথাটি শুনতে যতটা সাধারণ, পরিস্থিতির ভেতর থেকে দেখলে ততটাই অসাধারণ।
যে তরুণকে একটু পরেই এমন একটি অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হবে, যেখানে চিকিৎসকরা আগেই তাকে সতর্ক করেছেন—তার একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে—সেই তরুণের চিন্তা তখনও ভবিষ্যৎকে ঘিরে।
সে দেখতে চায়।
ভালোভাবে দেখতে চায়।
যারা তার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, তাদের সে অপারেশনের পর দেখতে চায়।
তার এই দৃঢ়তার কাছে শেষ পর্যন্ত ভয়ই যেন হেরে গেল।
কখনো কখনো মানুষের শরীর কতটা শক্তিশালী, তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের মন। হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আলিফকে দেখে মনে হচ্ছিল, সাহস আসলে কোনো বড় বক্তৃতার নাম নয়। সাহস কখনো কখনো মাত্র কয়েকটি শব্দে প্রকাশ পায়—
‘কোথায় সই করতে হবে?’
আরও কয়েকটি শব্দে—
‘আমি ভয় পাচ্ছি না।’
অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাইরে অপেক্ষা করা মানুষগুলোর কাছে সময় যেন থমকে যায়। প্রতিটি মিনিট দীর্ঘ হয়। চিকিৎসকদের প্রতিটি নড়াচড়া, দরজা খোলার প্রতিটি শব্দ, করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়া প্রতিটি মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা—সবকিছুতেই তখন একটাই প্রশ্ন।
আলিফ কি তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের উত্তর হয়তো এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু তার নিজের উত্তর ছিল পরিষ্কার—সে ভয় পায় না।
এই গল্প শুধু একটি চোখের অস্ত্রোপচারের গল্প নয়। এটি এমন এক তরুণের গল্প, যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছে। যে মুহূর্তে অধিকাংশ মানুষ একজন মা-বাবা, একজন অভিভাবক কিংবা প্রিয়জনের হাত খুঁজে বেড়াত, সেই মুহূর্তে আলিফ নিজের হাতেই নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে।
তার এই সাহসকে কোনো শব্দ দিয়ে মাপা কঠিন।
তবু একজন মানুষ হিসেবে প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে?
খোদা, চিকিৎসাবিজ্ঞান যাতে ভুল হয়।
আলিফের দুই চোখেরই দৃষ্টিশক্তি অটুট থাকুক।
অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে যখন সে বাইরে আসবে, তখন যেন সত্যিই হাসনাত, আসিফ ভাই এবং তার অপেক্ষায় থাকা সবাইকে ভালোভাবে দেখতে পারে।
যে তরুণ এত দৃঢ়ভাবে বলেছিল—‘আমি ভয় পাচ্ছি না’, তার চোখে যেন আবারও পৃথিবীটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
কারণ কিছু মানুষের চোখ শুধু তাদের নিজের পৃথিবীকে দেখে না; তাদের চোখে অনেক মানুষের আশা জমা থাকে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে হামলা করে ক্ষমাতাশীন দল বিএনপির ছাত্রসংগঠন ’ছাত্রদল ‘। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন দলটির কয়েকজন নেতাকর্মী। তার মধ্যে একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায় আলিফের উপর হামলা করছে কয়েকজন। পরে জানযায়, এই হামলায় বাম চোখের ক্ষতি হয়। ডক্তার পরিক্ষানিরিক্ষা করে জানান, দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
মেডিকেল বোডের সিদ্ধানে আজ বৃহষ্পতিবার দুপরে তার চোখের অশ্রপাচার করেন চিকিৎসকরা।
Author