
বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পছন্দ করেন শেখ হাসিনা। বিরোধী দলে, সরকারি দলে কিংবা পলাতক অবস্থায়—সব সময়ই তাঁকে আলোচনায় থাকতে দেখা যায়। বর্তমানে ভারতে আশ্রিত অবস্থায়ও বিভিন্ন বক্তব্য ও ঘোষণার মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেষ্টা করছেন।
জুলাইয়ে শুরু হওয়া ৩৬ দিনের আন্দোলনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার কঠোর দমন-পীড়নের ফলে প্রায় ১,৪০০ সাধারণ মানুষ নিহত। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন কোনো প্রধানমন্ত্রীর এভাবে দেশত্যাগের ঘটনা এটিই প্রথম।
দেশ ছাড়ার আগেই শেখ হাসিনা তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেন এবং ৫ আগস্ট ভোর হওয়ার আগেই তাঁরা দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপর গত দুই বছর ধরে প্রায় প্রতি মাসে, এমনকি বিভিন্ন সময় ধারাবাহিকভাবে তিনি দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে আসছেন।
তাঁর প্রতিটি ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক রাজপথে নেমে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করেছেন। আদালতের আদেশে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরাই বেশি ঝুঁকি ও হয়রানির মুখে পড়ছেন।
নিছক স্টান্টবাজি?
বারবার দেশে ফেরার ঘোষণাকে অনেকেই নিছক স্টান্টবাজি হিসেবে দেখছেন। শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন—এমন ঘোষণা একাধিকবার এলেও এখন পর্যন্ত তাঁকে প্রকাশ্যে কোথাও দেখা যায়নি। ফলে তাঁর এই ঘোষণাগুলো বাস্তব পরিকল্পনার অংশ, নাকি রাজনৈতিক কৌশল—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং আওয়ামী লীগকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতেই শেখ হাসিনা এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন। দলটির একাধিক সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনাকে সামনে না রেখে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের আলোচনা যখন চলছে, ঠিক তখনই তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা অনেক নেতা-কর্মীর কাছে রাজনৈতিক স্টান্ট বলেই মনে হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার কঠোর সমালোচনা করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই ঘোষণাকে ‘ভণ্ডামি’ বলে আখ্যা দেন।
তাঁর অভিযোগ, বিদেশে অবস্থান করে শেখ হাসিনা এ ধরনের ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ ও নিরীহ নেতা-কর্মীদের আরও বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।
সোহেল তাজ আরও অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা নিজে দেশ ছেড়ে বিদেশে নিরাপদ অবস্থানে থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, অথচ দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে দলের সাধারণ নেতা-কর্মীদের জীবন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছেন।
তার মতে, শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ‘ইগো’ বা অহংকার একটি দেশ এবং একটি রাজনৈতিক দল—উভয়েরই বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা ৫ আগস্টের আগেই দেশ ত্যাগ করেন
শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগের আগেই তাঁর পরিবারের সব সদস্য দেশ ছেড়ে চলে যান। তাদের মধ্যে শেখ রেহানা, শেখ হেলাল, শেখ সেলিম, ফজলে নূর তাপসসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এমনটি কাজের লোকটাও চলে যায়। ৫ আগস্টের ভোর হওয়ার আগেই তাঁদের অধিকাংশই দেশ ত্যাগ করেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট সকালে শেখ হাসিনা বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে দেশ ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর জনরোষের মুখে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত।
আওয়ামী লীগের আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন নেতা-কর্মীর দাবি, যে নেত্রী নিজের পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের নিরাপদে দেশ ছাড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন, তিনি সংকটের মুহূর্তে দলের নেতা-কর্মীদের পাশে ছিলেন না। তাদের ভাষ্য, পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হলেও সাধারণ নেতা-কর্মীদের অনেকেই গ্রেপ্তার, মামলা ও নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েন। এ কারণেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে দলের ভেতরের অনেকেই সংশয়ের চোখে দেখছেন।
এ বিষয়ে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা দাবি করেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ফলে তাঁর পরিবার নিরাপদে থাকলেও দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী সংকটে পড়ে যান। তিনি তুলনা টেনে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন নেতা দেশ ছেড়ে না গিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর মতে, এই বাস্তবতার কারণেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে দলের অনেক নেতা-কর্মী এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নয়ন ও ভারতের চাপ তৈরির অভিযোগ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার চার মাসের মধ্যেই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর, চীনের সঙ্গে একাধিক বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার আলোচনা এবং ২৪টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য উদ্যোগ—এসব বিষয় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতা ভারতের কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে। আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে ভারত বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাব্য উদ্যোগকে এই কৌশলের অংশ বলেও বিশ্লেষকদের মনে করেন।
রাজনৈতিক দলগুলো কী বলছে
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার চলছে এবং আদালতই তার অপরাধ ও শাস্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। দলটির নেতারা দাবি করেন, সরকার বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো হস্তক্ষেপ করছে না এবং আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বিচার চলছে।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পেছনে সম্ভাব্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। দলটির মতে, এ ঘটনার সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কিছু শক্তি কিংবা সরকারের কোনো অংশ জড়িত থাকতে পারে এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। তবে একই সঙ্গে তারা বলেছে, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হতে চাইলে সেটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য এবং বিষয়টি তারা রাজনৈতিকভাবে আরও পর্যবেক্ষণ করে মূল্যায়ন করবে।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তা কেবল তার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্যই হওয়া উচিত। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, ভারতের কাছে এ বিষয়ে কঠোর বার্তা পাঠাতে এবং দাবি করেন, দণ্ডিত আসামি হিসেবে শেখ হাসিনার বিদেশে বসে রাজনৈতিক বক্তব্য বা সাক্ষাৎকার দেওয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
হাসিনা আত্মসমর্পনের জন্যেই দেশে ফেরার কথা বলছেন
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের মুখে তিনি নিজের দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হতে চান এবং নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদেরও তাঁর সঙ্গে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। তবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের অনেকে মনে করছেন, ডিসেম্বরের সময়সীমা বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। তাঁদের মতে, দলকে পুনরায় সক্রিয় করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করা এবং নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙা করাই এ ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
দেশে ফিরলে কী হবে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ২১ ধারা অনুযায়ী রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে আপিল বিভাগ সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের "সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার" নীতির আলোকে বিলম্বিত আপিল গ্রহণ করার নজির রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চাইলে প্রথমে তাঁকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে, তাই আত্মসমর্পণের পর তাঁকে কারাগারে যেতে হবে এবং সেখান থেকেই বিলম্বিত আপিলের আবেদন বা অন্যান্য আইনি প্রতিকার চাইতে হবে। বিলম্বিত আপিল গ্রহণ করা হবে কি না, তা সম্পূর্ণ আদালতের বিবেচনার বিষয়। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি বা ন্যাচারাল জাস্টিস-এর অংশ।
দেশে ফেরার ক্ষেত্রেও কিছু বাস্তব আইনি জটিলতা রয়েছে। আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, শেখ হাসিনার সরকারি লাল পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় বর্তমানে তাঁর কাছে বৈধ ভ্রমণ দলিল নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে ফিরতে তাঁর ট্রাভেল পাস প্রয়োজন হবে, যা দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের হাতে। দেশে ফিরেই বিদ্যমান গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তবে তিনি আপিল করলে সুপ্রিম কোর্টের বিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ (স্টে) চাওয়ার সুযোগ থাকবে এবং পরে মূল আপিলের শুনানি হবে।
তার ফেরার সম্ভবনা কতটুকু
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা মূলত তাঁর আইনি জটিলতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও, বিশ্লেষকদের মতে সার্বিক বাস্তবতায় এই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
Author