
একটি দেশের সংস্কৃতি তার আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্দেশকগুলোর একটি। একটি জাতি কীভাবে কথা বলে, কীভাবে পোশাক পরে, কীভাবে আনন্দ-বেদনা প্রকাশ করে, কীকে ভালো-মন্দ মনে করে—এসবের পেছনে সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। আধুনিক বিশ্বে মানুষের সংস্কৃতি নির্মাণ ও পরিবর্তনের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে দৃশ্যমান বিনোদন—নাটক, সিনেমা, ওয়েব সিরিজ এবং এখন সবচেয়ে বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও ও রিলস।
একসময় একটি দেশের সংস্কৃতি জানতে হলে সেই দেশের বই পড়তে হতো, মানুষের সঙ্গে মিশতে হতো, ইতিহাস জানতে হতো। এখন সেই জায়গার বড় একটি অংশ দখল করেছে পর্দা। একটি নাটক কিংবা একটি সিরিজ শুধু গল্প বলে না; এর মাধ্যমে একটি সমাজ তার ভাষা, পোশাক, সম্পর্ক, পারিবারিক কাঠামো, জীবনযাপন, রসবোধ এবং মূল্যবোধও অন্যদের সামনে তুলে ধরে।
তুরস্কের কথাই ধরা যাক। তুর্কি ধারাবাহিক ও ঐতিহাসিক সিরিজের জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বের বহু মানুষ নতুন করে তুরস্কের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পোশাক, স্থাপত্য, পারিবারিক সম্পর্ক এবং জীবনধারা সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছে। একইভাবে ভারতীয় সিনেমা, টেলিভিশন নাটক ও সিরিয়াল দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সমাজ, পরিবার, উৎসব, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রার নানা দিক বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে।
অর্থাৎ বিনোদন এখন শুধু বিনোদন নয়। এটি সংস্কৃতি প্রদর্শনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি দেশের সফট পাওয়ার।
এই জায়গায় বাংলাদেশের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে—আমরা আসলে কী করতে চাই?
বাংলাদেশের নাটক ও সিনেমার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। একসময় নাটক ছিল মানুষের চিন্তা, সমাজ ও জীবনের আয়না। নাটকের গল্পে থাকত পরিবার, সম্পর্ক, সামাজিক অসঙ্গতি, হাসি-কান্না, মানবিকতা, প্রেম, প্রতিবাদ এবং মানুষের স্বপ্ন। অনেক নাটক দর্শককে শুধু বিনোদন দেয়নি; চিন্তাও করতে শিখিয়েছে।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণের পর নাটকের চরিত্র ও উদ্দেশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। এখন একটি বড় অংশের লক্ষ্য হচ্ছে—কত দ্রুত কনটেন্ট বানানো যায়, কত বেশি ভিউ পাওয়া যায় এবং সেই ভিউ থেকে কত টাকা আয় করা যায়। ফলে গল্পের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘কনটেন্ট’, আর কনটেন্টের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘ভিউ’।
আমি নিশ্চিত, আপনার মোবাইলেও আমার মতো এমন অনেক রিলস সামনে আসে, যার কোনো মাথামুণ্ডু খুঁজে পাওয়া কঠিন। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি, অশালীন ভাষা, মারামারি, অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা হাস্যকর কোনো পরিস্থিতিকে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
একদিন বাসায় গিয়ে দেখলাম, আমার চার বছরের মেয়ে মোবাইলে রিলস দেখছে। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। তার মনোযোগ নষ্ট না করে আমিও পাশে বসে দেখতে শুরু করলাম—সে কী দেখছে?
প্রায় ১০ মিনিট দেখার পর বুঝলাম, এই কনটেন্ট আমি আমার সন্তানকে দেখতে দিতে পারি না। একটি ছোট্ট শিশু আরেকটি শিশুর পেছনে লাঠি নিয়ে দৌড়াচ্ছে। তার সঙ্গে এমন ভাষায় কথা বলা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই শালীন বলা যায় না। অথচ সেটিই একটি শিশুর সামনে বিনোদন হিসেবে হাজির হচ্ছে।
এখানে শুধু একটি ভিডিওর প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা আগামী প্রজন্মকে কী দেখাচ্ছি?
দর্শক যা দেখছে, সেটাই কি তার প্রাপ্য?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার মতো কনটেন্টকে সামনে আনে। ফলে যে ভিডিও যত বেশি উত্তেজনা, হাসি, বিস্ময় কিংবা বিতর্ক তৈরি করে, সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বেশি।
এই বাস্তবতায় একজন নির্মাতা যদি জানেন যে অশালীন সংলাপ, অদ্ভুত আচরণ কিংবা চটকদার দৃশ্যের কারণে কয়েক লাখ ভিউ পাওয়া যায়,
তাহলে তিনি কেন গভীর গল্প লিখবেন?
সমস্যা এখানেই।
দর্শকের রুচিকে উন্নত করার পরিবর্তে আমরা অনেক ক্ষেত্রে দর্শকের তাৎক্ষণিক আগ্রহকে অনুসরণ করছি। আর একসময় দর্শকের চাহিদা এবং নির্মাতার ব্যবসায়িক স্বার্থ পরস্পরকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে একটি নিম্নমানের কনটেন্টও ‘জনপ্রিয়’ হয়ে ওঠে। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর মান এক জিনিস নয়।
একটি ভিডিওর ১০ লাখ ভিউ হতে পারে। কিন্তু সেই ভিডিও সমাজকে কী দিয়েছে—সেটি আলাদা প্রশ্ন।
কিছুদিন আগে দেশের একজন পরিচিত স্ক্রিপ্টরাইটারের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তাঁর কাছ থেকে শুনলাম, একটি প্রায় ৪০ মিনিটের নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখার জন্য অনেক সময় একজন লেখককে মাত্র কয়েক হাজার টাকা দেওয়া হয়। অথচ সেই স্ক্রিপ্টের চূড়ান্ত রূপে লেখকের স্বাধীনতা কতটুকু থাকে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
পরিচালকের নিজস্ব চাহিদা আছে। প্রযোজকের ব্যবসায়িক হিসাব আছে। প্ল্যাটফর্মের ভিউয়ের হিসাব আছে। প্রযোজক চান তাঁর বিনিয়োগ ফেরত আসুক। পরিচালক চান নাটকটি জনপ্রিয় হোক। প্ল্যাটফর্ম চায় দর্শক ধরে রাখতে। আর লেখক?
লেখকের দায়িত্ব হচ্ছে এসব চাহিদার মধ্যে গল্প তৈরি করা। ফলে কোথাও কোথাও গল্পের ভেতর থেকে সমাজের কথা, মানুষের কথা, মূল্যবোধের কথা কিংবা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে যাচ্ছে।
অবশ্যই সব নাটক এমন নয়। বাংলাদেশের অনেক নির্মাতা এখনও ভালো কাজ করছেন। অনেক তরুণ নির্মাতা নতুন ভাষা ও নতুন গল্প নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার অভাব চোখে পড়ে।
আমার এলাকার এক ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। এইচএসসি পরীক্ষায় ধর্মশিক্ষা ছাড়া প্রায় সব বিষয়ে সে ফেল করেছিল। পরবর্তী সময়ে শুনলাম, সে মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল। জীবনটা যেন অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল।
প্রায় ১০ বছর পর একদিন শুনলাম, সেই ছেলেটিই জাতীয় পর্যায়ের একটি পুরস্কার পেয়েছে। আমি অবাক হলাম। বুঝলাম, পরীক্ষার খাতায় যে ছেলে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেনি, সে জীবনের অন্য জায়গায় নিজেকে বদলে ফেলেছে। নিজের মেধা ও সৃজনশীলতা দিয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই তার নাটক দেখার প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হলো। ভাবলাম, যে ছেলেটি জীবনকে এতটা ঘুরিয়ে দিতে পেরেছে, তার সৃষ্টিশীলতায় নিশ্চয়ই আলাদা কিছু আছে।
খুব আগ্রহ নিয়ে তার নাটক দেখতে বসলাম।
কিন্তু নাটকের মাঝামাঝি এসে আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলাম না। টেলিভিশনের সুইচ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম।
মনে মনে বললাম—তার তো ১০ বিষয়ে নয়, ১১ বিষয়েই ফেল করার কথা ছিল!
অবশ্য এটি আমার ব্যক্তিগত রসবোধের একটি প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—একজন মানুষের ব্যক্তিগত সাফল্য কি তার সৃষ্টিশীল কাজের মানের নিশ্চয়তা?
উত্তরটি অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ নয়।
একজন মানুষ ভালো শিল্পী হতে পারেন, কিন্তু তার প্রতিটি কাজ ভালো হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে একটি নাটক প্রচুর জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু সেটি সমাজের জন্য ভালো—এমনও নয়।
এখানে সরকারকে সেন্সরশিপের পথে হাঁটতে হবে—এমন কথা আমি বলছি না। বরং সরকারকে এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভালো নাটক ও ভালো গল্প তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে অনেকটাই বাজারনির্ভরতা কাজ করছে। যার ভিউ বেশি, তার আয় বেশি; যার আয় বেশি, তার কনটেন্ট আরও বেশি তৈরি হয়। এই চক্রের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে।
এই জায়গায় সরকারের একটি জাতীয় নাটক ও অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। নীতিমালাটি যেন কোনো দল, সরকার বা মতাদর্শের প্রচারণার হাতিয়ার না হয়। বরং এর লক্ষ্য হওয়া উচিত—বাংলাদেশের ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামীণ জীবন, নগরজীবন, পরিবার, নারী, শিশু, তরুণ প্রজন্ম, পরিবেশ, বিজ্ঞান, মানবিকতা এবং সমকালীন সামাজিক বাস্তবতাকে সৃজনশীলভাবে তুলে ধরা।
প্রথমত, জাতীয় নাটক উন্নয়ন তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
প্রতি বছর নির্দিষ্ট বাজেট রেখে ভালো গল্প ও চিত্রনাট্যের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। নির্বাচিত চিত্রনাট্যকে অনুদান দেওয়া হবে। তবে অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, গল্পের মান, নির্মাণ পরিকল্পনা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্ক্রিপ্টরাইটারদের জন্য আলাদা সহায়তা চালু করা দরকার।
একটি ভালো নাটকের প্রাণ হলো চিত্রনাট্য। অথচ লেখকই অনেক সময় সবচেয়ে কম মূল্য পান। লেখকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, রয়্যালটি এবং কপিরাইট নিশ্চিত করতে হবে। একজন লেখক যেন একটি গল্প লিখে একবার টাকা নিয়ে চিরতরে তার অধিকার হারিয়ে না ফেলেন।
তৃতীয়ত, শিশু ও কিশোরদের জন্য আলাদা কনটেন্ট নীতি দরকার।
চার-পাঁচ বছরের শিশু থেকে শুরু করে কিশোরদের হাতে এখন মোবাইল। তারা ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিডিও দেখে। তাদের জন্য মানসম্মত বাংলা কনটেন্ট তৈরিতে রাষ্ট্রকে প্রণোদনা দিতে হবে।
কারণ আজ যে শিশুটি রিলস দেখছে, আগামী দিনের দর্শক সে-ই।
চতুর্থত, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিরিজ তৈরিতে উৎসাহ দিতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গল্পের অভাব নেই। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নদী, গ্রাম, নগরায়ণ, লোকসংস্কৃতি, বাউল, পালাগান, আঞ্চলিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ, প্রবাসী জীবন—অসংখ্য বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের সিরিজ তৈরি করা সম্ভব।
শুধু অতীতের গল্প নয়, বর্তমান বাংলাদেশের গল্পও বিশ্বকে বলা দরকার।
পঞ্চমত, সরকারি অর্থে নির্মিত কনটেন্টের মান নিশ্চিত করতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বোর্ড থাকা উচিত।
বোর্ডে শুধু সরকারি কর্মকর্তা নয়—নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞানী, শিশু বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
তবে বোর্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হবে—এর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে।
ষষ্ঠত, ভালো কনটেন্টকে কর ও অন্যান্য প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
যে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য মানসম্মত অনুষ্ঠান তৈরি করবে, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরবে কিংবা আন্তর্জাতিক মানের বাংলা সিরিজ নির্মাণ করবে, তাদের জন্য কর-সুবিধা বা বিশেষ প্রণোদনা বিবেচনা করা যেতে পারে।
সপ্তমত, নাটককে শুধু বিনোদন শিল্প হিসেবে না দেখে সাংস্কৃতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তুরস্ক তার ধারাবাহিকের মাধ্যমে যেমন বিশ্বের মানুষের কাছে নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পরিচিত করেছে, দক্ষিণ কোরিয়া তার সিনেমা ও সিরিজের মাধ্যমে কোরিয়ান সংস্কৃতিকে বৈশ্বিকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে, ভারতও তার চলচ্চিত্র ও সিরিয়ালের মাধ্যমে নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছে।
বাংলাদেশও এটি করতে পারে।
আমাদের গল্প আছে। আমাদের মানুষ আছে। আমাদের ইতিহাস আছে। আমাদের নদী আছে। আমাদের ভাষা আছে। আমাদের লোকসংস্কৃতি আছে। আমাদের সংগ্রাম আছে। প্রয়োজন শুধু সেই গল্পগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের ভাষায় বলার সক্ষমতা।
নাটক কখনো সমাজের শিক্ষক, কখনো সমাজের আয়না, আবার কখনো সমাজ পরিবর্তনের অনুঘটক হতে পারে। কিন্তু নাটক যদি কেবল ভিউয়ের পেছনে দৌড়ায়, তাহলে সেখানে সমাজের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
আমরা এমন নাটক চাই না, যা শুধু দর্শককে দুই ঘণ্টা হাসাবে। আমরা এমন নাটকও চাই না, যা কেবল কান্না করাবে। আমরা চাই এমন নাটক, যা বিনোদন দেবে, কিন্তু একই সঙ্গে ভাবাবে।
যে নাটক দেখে একজন তরুণ তার জীবন নিয়ে নতুন করে ভাববে। যে নাটক দেখে একজন বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে কথা বলবেন।
যে নাটক দেখে একজন শিশু নিজের ভাষা, দেশ ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে শিখবে। যে নাটক দেখে বিদেশের একজন দর্শক বাংলাদেশকে জানতে আগ্রহী হবে।
বাংলাদেশের নাটক ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, বাংলাদেশের নাটক একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, আবার একই সঙ্গে তৈরি করেছে নতুন সংকট।
সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়। সমস্যা পরিকল্পনার অভাবে। আমরা যদি শুধু ভিউয়ের হিসাব করি, তাহলে হয়তো অনেক ভিডিও তৈরি হবে। কিন্তু সেগুলো আমাদের সংস্কৃতিকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না।
একটি দেশের সংস্কৃতি রাতারাতি তৈরি হয় না। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হয়। তাই আজ আমরা যে গল্প লিখছি, যে নাটক বানাচ্ছি, যে ভিডিও শিশুর হাতে তুলে দিচ্ছি—সেগুলোই কোনো না কোনোভাবে আগামী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতি হয়ে থাকবে।
সুতরাং এখনই সময় ভাবার।
আমরা কি শুধু নাটক বানাতে চাই, নাকি বাংলাদেশের গল্প বলতে চাই?
যদি শুধু নাটক বানাতে চাই, তাহলে বাজারই সিদ্ধান্ত নিক। কিন্তু যদি বাংলাদেশের গল্প বলতে চাই, তাহলে রাষ্ট্র, নির্মাতা, লেখক, প্রযোজক এবং দর্শক—সবাইকে নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ নাটক শুধু বিনোদন নয়।
নাটক একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার।
আর সেই ভবিষ্যৎ যদি পরিকল্পনাহীন হয়, তাহলে একদিন হয়তো আমরা অনেক নাটক পাব—কিন্তু আমাদের বলার মতো গল্প থাকবে না।

Author