
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শন করায় আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস খেলোয়াড়দের বাক্স্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে ফিফা আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যও এ ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের পর মাঠে উদযাপনের সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ এবং ম্যাচে না-খেলা বদলি খেলোয়াড় জিওভানি লো সেলসো "Las Malvinas son Argentinas" (ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার) লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন। তারা হাসিমুখে দর্শকদের দিকে হাত নাড়তে নাড়তে ব্যানারটি তুলে ধরেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কারণ, দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ফিফা টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে আর্জেন্টিনা দলের ওই ধরনের বক্তব্য দেওয়ার অধিকার ছিল।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী (First Amendment) উল্লেখ করে বলেন, "আমরা যুক্তরাষ্ট্রে বাক্স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারকে বিশ্বাস করি।" তার এই মন্তব্য বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনার পর ফিফা নিশ্চিত করেছে যে, এটি "নিয়মিত প্রক্রিয়ার" অংশ হিসেবে তদন্ত করছে। ফিফার একজন মুখপাত্র আল জাজিরাকে বলেন, "ফিফার স্বাধীন শৃঙ্খলা কমিটি বর্তমানে ম্যাচ রিপোর্ট মূল্যায়ন করছে এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করছে। এরপর ফিফার শৃঙ্খলা বিধির আলোকে সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধি অনুযায়ী, ক্রীড়া ইভেন্টে রাজনৈতিক, আদর্শিক, ধর্মীয় বা আপত্তিকর বার্তা প্রদর্শন নিষিদ্ধ। এ ধরনের অপরাধে খেলোয়াড় কিংবা সংশ্লিষ্ট ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। রাজনৈতিক বার্তার জন্য সাধারণত ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানা করা হয়।
ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্র বলেন, "বিশ্বকাপ হয়তো আমাদের নয়, কিন্তু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ অবশ্যই আমাদের। দ্বীপবাসীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণের অধিকারই এখানে প্রাধান্য পায় এবং ফকল্যান্ডের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার কখনোই টলবে না।"
১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট জানায়, খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটি ফিফার বিষয়। তবে তারা বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
ব্যবসা বিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল বলেন, "রাজনীতিকে ফুটবল থেকে আলাদা রাখতে হবে। বিশ্বকাপের অন্যতম মৌলিক নীতিই হলো রাজনীতি ফুটবল থেকে আলাদা থাকবে।"
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সরকারও ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, "আমরা খেলাধুলায় রাজনীতিকে নিয়ে আসতে চাই না। একই সঙ্গে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার প্রতিটি আলোচনায় দ্বীপপুঞ্জ ও এর জনগণকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাও দেখতে চাই না।"
বুধবার যখন লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এই ব্যানার ১৯৮২ সালের যুদ্ধের প্রবীণ যোদ্ধাদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করতে পারে কি না, তিনি বলেন, "আমরা আর্জেন্টিনার জনগণকে হতাশ করতে পারতাম না।"
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই খেলোয়াড়দের পদক্ষেপকে "সম্পূর্ণ বৈধ" বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, "এই বার্তাটি সব আর্জেন্টাইনদের অভিন্ন অনুভূতির প্রতিফলন।"
তবে তিনি স্বীকার করেন, ফিফা সম্ভবত এ ঘটনার জন্য দলটিকে জরিমানা করবে। বুয়েনস আইরেসের একটি রেডিও স্টেশনকে মিলেই বলেন, "খেলোয়াড়রা আবেগের বশে কাজ করেছে। এটি বোধগম্য। তবে সম্ভবত এর ফলে জরিমানা নিয়ে আলোচনা হবে।"
অন্যদিকে, ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়াররুয়েল ইংরেজদের "দখলদার জলদস্যু" বলে উল্লেখ করেন। পরে তিনি এক্স-এ লিখেন, "ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার। তারা এগুলো স্টেডিয়ামে আনতে নিষেধ করেছে, কিন্তু ভুলে গেছে—আমরা এগুলো আমাদের রক্তে এবং হৃদয়ে বহন করি।"
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আটলান্টিকে অবস্থিত ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণ চালায়। পরে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার নৌবাহিনী পাঠালে ৭৪ দিনব্যাপী যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য পুনরায় দ্বীপপুঞ্জটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
ওই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সামরিক সদস্য এবং ফকল্যান্ডের তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের জনগণ বিপুল ভোটে যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থেকে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়। ১,৫১৭টি ভোটের মধ্যে ১,৫১৩টি যুক্তরাজ্যের পক্ষে এবং মাত্র তিনটি বিপক্ষে পড়েছিল।
বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে জয়ের পর আর্জেন্টিনার সরকার জানায়, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস মেডওয়ে-এর উপস্থিতির বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।
আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, যুদ্ধজাহাজটি যথাযথ পূর্ব অবহিতকরণ ছাড়াই আর্জেন্টিনার আঞ্চলিক জলসীমা অতিক্রম করেছে।
ফিফার ইতিহাসে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের কারণে শাস্তির নজির রয়েছে।
· ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের আগে একই "Las Malvinas son Argentinas" স্লোগান প্রদর্শনের কারণে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনকে ৩০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করা হয়েছিল।
· ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে "Dokdo is our territory" ব্যানার প্রদর্শনের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড় পার্ক জং-উকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা।
· ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে কসোভো-সংক্রান্ত রাজনৈতিক ব্যানার টাঙানোর কারণে সার্বিয়া ফুটবল ফেডারেশনকে ২০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করা হয়।
সব বিতর্কের মধ্যেই রোববার নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে মাঠে নামবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের আগেই ফিফার তদন্তের ফলাফল এবং সম্ভাব্য শাস্তির বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
Author