ফুটবল সম্ভবত মেসির চেয়ে সুন্দর কিছু কখনও দেখেনি। বাগানে ফুটে থাকা সবচেয়ে সুন্দর গোলাপ। ফাইনালে স্পেন হয়তো কিছুটা এগিয়েই থাকবে। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, মেসি আরেকটি বিশ্বকাপ জিতবেন—এটা নিয়তি নির্ধারিত। এ রায় দেওয়ার জন্য, মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার।

বয়স হচ্ছে। আবার বয়স কমছেও বটে। ক্রমশ এগুচ্ছি অনন্ত যাত্রার দিকে। আবার কিছুটা শিশুও কি হচ্ছি না।
আহমেদ সাবিত। আমার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে। খালামনি তাকে ব্রাজিলের জার্সি কিনে দিয়েছে। স্বভাবতই সে ব্রাজিলের সাপোর্টার। কিন্তু প্রিয় দলের পরাজয় এখনও তাকে দুঃখ দেয় না।
আমার অবস্থাও অনেকটা তাই। প্রিয় দলের জয় কিংবা পরাজয় খুব একটা আন্দোলিত করে না।
আমি নিজে কেন আর্জেন্টিনার সাপোর্টার, ক’দিন ধরে মনে মনে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম।
ম্যারাডোনা?
ম্যারাডোনার খেলা দেখিনি। বইতে পড়েছি ‘কালো মানিক’ পেলের গল্প। তারপরও ম্যারাডোনা তীব্রভাবে আন্দোলিত করেছিল। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বাঙালির বিশ্বাস সম্ভবত তখন থেকেই প্রকট ছিল। যে কারণে আমাদের সবসময় মনে হতো ম্যারাডোনা ষড়যন্ত্রের শিকার।
তারপর, ২০২৬ সাল পর্যন্ত গল্পটা ছিল একই। কিছুটা ব্যতিক্রম ২০১৪।
একই রুটিন। একেকটা নতুন ম্যারাডোনা আসতো। মাঝমাঠে কিছু কাটাকুটি করতেন। আর্জেন্টিনা বাদ পড়তো দ্রুতই।
সবাই আশা করছিলো এই যন্ত্রণাময় অধ্যায় কেবল একজনই পাল্টাতে পারেন। রোজারিওর ছোট্ট জাদুকর!
লিওনেল মেসিকে কখনও কখনও আমাদের পাশের বাড়ির বন্ধু মনে হয়। গড়পড়তা উচ্চতা বাঙালির মতো। দাদুর স্নেহ তার জীবনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। এসব কথা সবারই জানা। তবুও একবার লিখে রাখতে হয়। খুব ছোট বেলায় পাড়ি জমিয়েছেন বার্সেলোনাতে। ক্লাব তার বিরল রোগের চিকিৎসার ব্যয়ভার মিটিয়েছে। বলা হয়, টিস্যু পেপারে সই করা চুক্তিতে একটি ক্লাবে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়টি।
বার্সেলোনা যেদিন ছাড়েন শিশুর মতো তার কান্না নিশ্চয় খেয়াল করেছেন।
একটা সময় পর্যন্ত আর্জেন্টাইনরা তাকে মনে-প্রাণে মেনে নেয়নি। কখনও কখনও অভিমানও তাকে পেয়ে বসছিল। ক্লাবের হয়ে সব জিতছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপ, আহা বিশ্বকাপ।

চৌদ্দ সালে একেবারে কাছে গিয়েও ধরতে পারলেন না। মনে হলো মেসি আর কোনোদিন বিশ্বকাপ জিততে পারবেন না।
ক্লাবের হয়ে সব জেতার পরও ক্রিশ্চিয়ানোকে মনে হতো তার প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু কাতারে এসে সব অঙ্ক মিলিয়ে দিলেন লিও। বিশ্বকাপ হাতে জাদুকর, ফুটবলে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী!
তিনি আরেকটি বিশ্বকাপ খেলবেন এটা কেউ ভাবেনি।
তিনি খেলছেন। এবং রীতিমতো অবিশ্বাস্য। মনে হচ্ছে, এই পান্ডুলিপি এই পৃথিবীতে কেউ লেখেননি।
সেমিফাইনালে দেখেছেন, কীভাবে একের পর এক ড্রিবলিং করে ইংলিশদের ছিটকে দিচ্ছেন। তার বয়স ৩৯—এটা কেউ বিশ্বাস করে না। এখন কেউ কেউ বলছেন, মেসি চাইলে পরের বিশ্বকাপও খেলতে পারেন।
এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে কী?
আট গোল, চার অ্যাসিস্ট! অবিশ্বাস্য!
তবে সবাই বলছেন, মেসির মাঠব্যাপী দার্শনিকের মতো হেঁটে চলার কথা! এ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮.২ কিলোমিটার হেঁটেছেন মেসি। প্রায় ৬৩-৬৪ শতাংশ সময়ই তিনি হাঁটছেন।
মেসির প্রিয় গুরু গার্দিওলা বহু আগে বলেছিলেন, হাঁটার সময়টা পুরো মাঠের একটা স্ক্যানিং করে নেন মেসি। দেখেন প্রতিপক্ষের দুর্বলতা। কোথায় জায়গা বের করা সম্ভব। একটা ম্যাপ এঁকে নেন। তারপর সুযোগ বুঝে মুহূর্তে পাল্টে দেন পরিস্থিতি।
আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন মাঝেমধ্যেই নজরে পড়তো হাঁটা বাবাকে। মোহাম্মদপুরের কথিত এই পীর কখনও কখনও ক্যাম্পাস দিয়েও হাঁটতেন। সঙ্গে তার শিষ্যরা। কখনও তিনি বসে পড়তেন। সঙ্গীরা সবাইও অনুসরণ করতেন তাকে। হাঁটা পীরও মেসির মতো কিছু ভাবতেন কি না কে জানে!
কাল আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে মাঠে নামবেন মেসি।
পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি? সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে? এ প্রশ্ন উচ্চকিত হচ্ছে।
তারা আলাদা যুগের খেলোয়াড়। স্বভাবই এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন।
কিন্তু আমার মতো সাধারণ দর্শকের কথা যদি বলি, ফুটবল সম্ভবত মেসির চেয়ে সুন্দর কিছু কখনও দেখেনি। বাগানে ফুটে থাকা সবচেয়ে সুন্দর গোলাপ।
ফাইনালে স্পেন হয়তো কিছুটা এগিয়েই থাকবে।
কিন্তু কেন যেন মনে হয়, মেসি আরেকটি বিশ্বকাপ জিতবেন—এটা নিয়তি নির্ধারিত।
এ রায় দেওয়ার জন্য, মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার।
Author