
একজন ঈমানদারের ঈমানের পূর্ণতার অন্যতম দাবি হলো—সে হালাল রিজিক অন্বেষণ করবে এবং নিজের কর্মজীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করবে।
হালাল উপার্জনের চেষ্টা নিঃসন্দেহে একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু শুধু দুনিয়াবি জীবনে সৎ থাকলেই ঈমানের পূর্ণতা অর্জিত হয় না; এর সঙ্গে আল্লাহর হক আদায় এবং ফরজ বিধান পালনের প্রতিও যত্নশীল হতে হবে।
একজন মানুষ চুরি, দুর্নীতি, ঘুষ কিংবা প্রতারণা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে পারেন। কর্মক্ষেত্রেও তিনি সৎ ও দায়িত্বশীল হতে পারেন। কিন্তু যদি তিনি নামাজসহ ফরজ ইবাদত পালনে গাফেল হন, আল্লাহর হক আদায়ে উদাসীন থাকেন, তাহলে তার সততা প্রশংসনীয় হলেও ঈমানের পূর্ণতার জায়গায় ঘাটতি থেকে যায়।
আবার এমন মানুষও আছেন, যারা নিয়মিত ইবাদত করেন, আল্লাহর হক আদায়ের ব্যাপারে সচেতন; কিন্তু একই সঙ্গে বান্দার হক নষ্ট করেন। কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন, অযথা সময় অপচয় করেন, নিজের ওপর অর্পিত কাজকে গুরুত্ব দেন না কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে রূঢ় ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এটিও একজন মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনার বিষয়। কারণ আল্লাহর ইবাদত যেমন তাঁর হক, তেমনি মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা ও উত্তম আচরণও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কর্মক্ষেত্রে আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বও এক ধরনের আমানত। যে প্রতিষ্ঠান, যে দায়িত্ব এবং যে কর্মক্ষেত্রের মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন, সেখানে সময় ও শ্রমের যথাযথ ব্যবহার করা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
কর্মঘণ্টায় দায়িত্বে ফাঁকি দেওয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও সময়ের অপব্যবহার করা শুধু পেশাগত অনিয়ম নয়—এটি আমানতেরও খেলাফ।
তাই একজন সত্যিকারের মুমিনের জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করার সুযোগ নেই—এক ভাগ ইবাদতের আরেক ভাগ শুধু দুনিয়ার। বরং তার সততা, দায়িত্বশীলতা, সময়ানুবর্তিতা, পরিশ্রম, সহকর্মীর প্রতি সদাচরণ এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা—সবকিছুই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হলে তার কর্মজীবনও ইবাদতে পরিণত হতে পারে।
আধুনিক জীবনে একজন মানুষ তার জীবনের বড় একটি অংশ কর্মক্ষেত্রে অতিবাহিত করেন। দিনের দীর্ঘ সময় অফিস, ব্যবসা কিংবা পেশাগত কাজে ব্যয় হয়। তাই কর্মস্থলকে যদি আমরা শুধু অর্থ উপার্জনের জায়গা হিসেবে দেখি, তাহলে জীবনের একটি বিশাল অংশ আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
আসুন, আমরা উভয় দিক বিবেচনা করি। আল্লাহর হক আদায়ে যত্নবান হই, আবার বান্দার হকও যথাযথভাবে আদায় করি। হারাম উপার্জন থেকে নিজেদের বাঁচাই, কর্মক্ষেত্রে আমানতদার হই, দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান হই, সময়ের মূল্য বুঝি এবং সহকর্মীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করি।
আমাদের কর্মজীবন শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়—সঠিক নিয়ত, সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটিও হতে পারে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক সুন্দর পথ।
আমরা চাকরিজীবনে অনেক সময় এমন ভাবি—‘এই চাকরি না করলে আমি কীভাবে চলব? আমার পরিবার, আমার সন্তানদের ভরণ-পোষণ কীভাবে হবে?’ এই চিন্তা ধীরে ধীরে আমাদের মহান রবের ওপর তাওয়াক্কুল ও তাঁর স্মরণ থেকে উদাসীন করে ফেলতে পারে।
অথচ একজন মুমিনের উপলব্ধি হওয়া উচিত—চাকরি আমার রিজিকের মালিক নয়; রিজিকের মালিক মহান আল্লাহ। কর্মস্থল কেবল সেই রিজিক অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই কর্মস্থলকে আমাদের কাছে এক ধরনের আমানত হিসেবেও দেখতে হবে। কর্তৃপক্ষ আমাদের ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা আমানতদারিরই অংশ।
আমি যদি কর্মস্থলে নিজেকে দায়িত্বশীল ও কার্যকর রাখার পরিবর্তে দায়িত্ব পালনে গাফেল হই, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী না হই, সময় ও শ্রমের যথাযথ মূল্য না দিই—তাহলে শুধু কর্তৃপক্ষের হক নষ্ট হবে না; বরং একজন বান্দার হক নষ্ট করার জন্যও আমাকে মহান রবের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবিকা নির্বাহের যে মাধ্যম মহান আল্লাহ আমাদের জন্য খুলে দিয়েছেন, সেটিও তাঁর একটি নিয়ামত। সেই নিয়ামতের প্রতি দায়িত্বশীল না হওয়া, বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা না করা এবং অর্পিত দায়িত্বে অবহেলা করা একজন মুমিনের জন্য কখনোই কাম্য নয়।
তাই কর্মজীবনকে শুধু বেতন পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখলে চলবে না। সততা, দায়িত্ববোধ, নিষ্ঠা ও আমানতদারিতার সঙ্গে নিজের কাজকে ইবাদতের অংশে পরিণত করতে হবে। কর্মস্থলে যেমন মানুষের হক আদায় করতে হবে, তেমনি আল্লাহর হক আদায়েও সচেতন থাকতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—চাকরি হারানোর ভয় যেন কখনো আল্লাহকে হারানোর ভয়কে ছাপিয়ে না যায়। কারণ রিজিকের দরজা মানুষ খুলে দিতে পারে না, যদি মহান রব তা না খোলেন; আবার কোনো মানুষ তা বন্ধও করতে পারে না, যদি আল্লাহ তা খোলা রাখেন।
পরিশেষে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহাফের ৪৯ নম্বর আয়াত আমাদের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা—
“আর (সেদিন) আমলনামা সামনে রাখা হবে। তখন আপনি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবেন যে, তাতে যা আছে তার কারণে তারা আতঙ্কিত এবং তারা বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! এটা কেমন কিতাব? যা ছোট কিংবা বড় কোনো কিছুই হিসাব না রেখে বাদ দেয়নি!’ আর তারা যা কিছু করেছিল তা উপস্থিত পাবে। আর আপনার রব কারও ওপর জুলুম করেন না।”
সূরা আল-কাহাফ: ৪৯
তাই আসুন—আমাদের কর্মজীবনও হোক ইবাদত, দায়িত্ব হোক আমানত, উপার্জন হোক হালাল এবং প্রতিটি কাজের লক্ষ্য হোক মহান রবের সন্তুষ্টি।
Author