৭০ দিন পর এখন সতর্কতার সঙ্গে হলেও বলা যায়, বর্তমান হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালে যুদ্ধ করা হিজবুল্লাহ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। অন্তত তাদের সামরিক সংগঠন, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি এবং অভিযানের নমনীয়তার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্ট।

সম্প্রতি ইসরাইল ও লেবানন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে একটি চুক্তির ঘোষণা দেয়, যার লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান ‘যুদ্ধবিরতি’ নবায়ন করা এবং একটি ‘সমন্বিত’ সমাধানের পথে এগোনো। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও সামরিক অভিযান চলতে থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শুধু হিজবুল্লাহকেই তাদের হামলা বন্ধ করতে হবে। লেবাননের প্রতিরোধ সংগঠনটি দ্রুতই এ আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং একে ‘অযৌক্তিক, অপমানজনক ও অবমাননাকর’ বলে আখ্যা দেয়।
১০ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হিজবুল্লাহ দক্ষিণে ইসরায়েলের নতুন আক্রমণের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকর ক্ষয়যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এ যুদ্ধে তারা ড্রোন ও ছোট বিশেষায়িত ইউনিটের ওপর নির্ভর করে ইসরায়েলি বাহিনীকে ক্রমাগত ক্ষয় করছে, একই সঙ্গে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোও অক্ষুণ্ন রাখছে।
২০২৬ সালের মার্চে শুরু হওয়া সর্বশেষ সংঘাতের প্রায় ৭০ দিন পর এখন সতর্কতার সঙ্গে হলেও বলা যায়, বর্তমান হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালে যুদ্ধ করা হিজবুল্লাহ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। অন্তত তাদের সামরিক সংগঠন, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি এবং অভিযানের নমনীয়তার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্ট।
এই মূল্যায়ন বর্তমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও সংগঠনটির পারফরম্যান্স, ২০২৩ সালের ‘সমর্থন যুদ্ধ’ (হারব আল-ইসনাদ) এবং ২০২৪ সালের ৬৬ দিনের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা, পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কমান্ডার ও যোদ্ধাদের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম বা যুদ্ধকৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কমান্ড কাঠামো, যুদ্ধনীতি, বাহিনী মোতায়েনের ধরন এবং এমনকি যুদ্ধের বিজয় ও পরাজয়ের সংজ্ঞা নিয়েও গভীর পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে যা ঘটছে, তা অনেকটা ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত টানা ৩০ মাসের ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতার পর ধীরে ধীরে পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক অভিযোজনের একটি প্রক্রিয়া। তবে লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে, যা প্রতিরোধশক্তিকে নিরস্ত্র করতে চায়, কিন্তু দখলদার শক্তির কাছ থেকে কোনো ছাড় দাবি করছে না, তখন হিজবুল্লাহর টিকে থাকা যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতার ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।
সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায়। ৬৬ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান দুর্বলতা ছিল তাদের যোগাযোগব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড ও মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করার জটিলতা। যুদ্ধের কিছু পর্যায়ে এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিঘ্ন, প্রতিক্রিয়ায় বিলম্ব এবং যুদ্ধক্ষমতার ক্ষয় দেখা দিয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধে একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে অভিযান অব্যাহত রয়েছে, ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়নি এবং যুদ্ধক্ষেত্র ও সদর দপ্তরের মধ্যে যোগাযোগও বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, হিজবুল্লাহ তাদের যোগাযোগ ও কমান্ড ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে
তীব্র চাপ ও ভারী হামলার মধ্যেও—যেমন ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিলের হামলার সময়—তাদের সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি এবং কমান্ড চেইন তার সংহতি ধরে রাখতে পেরেছে। এই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো কার্যকর ফায়ার কন্ট্রোল, নিয়মিত বাহিনী রদবদল, সামনের সারিতে অস্ত্র সরবরাহ এবং এমনকি অফলাইনে যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও সংগ্রহ ও নিয়মিত প্রকাশ।
যে যুদ্ধে প্রতিপক্ষের আকাশসীমায় পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে এবং যেখানে বাহিনী ও অবকাঠামো সব সময় হামলার লক্ষ্যবস্তু, সেখানে সফল সংগঠন হলো সেই সংগঠন, যা কেন্দ্রীয় কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিজের যুদ্ধক্ষমতা বজায় রাখতে এবং আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারে।
বর্তমান হিজবুল্লাহ এমন একটি মডেলের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হয়, যেখানে নমনীয়তা, টিকে থাকার সক্ষমতা এবং অভিযানের ধারাবাহিকতা কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। এটি এমন একটি কাঠামো, যেখানে সংগঠনগত কাঠামোর চেয়ে মিশন বা দায়িত্ব পালনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। ফলে কিছু ইউনিট সরাসরি নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে, পূর্বনির্ধারিত নীতিমালার মধ্যে থেকেই তীব্র চাপের মধ্যেও অভিযান চালিয়ে যেতে ও হামলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
তবে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সম্ভবত তাদের যুদ্ধনীতিতেই ঘটেছে। ২০২৪ সালের যুদ্ধে মূলনীতি ছিল যেকোনো মূল্যে ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং শত্রুর অগ্রযাত্রা ঠেকানো, এমনকি এর জন্য ব্যাপক প্রাণহানিও মেনে নেওয়া। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন লক্ষণ থেকে বোঝা যায়, হিজবুল্লাহ ভিন্ন এক কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে—যার লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য সব উপায়ে শত্রুর ওপর ধারাবাহিক ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়া।
ক্রমাগত ক্ষয় সৃষ্টি এবং শত্রুপক্ষের হতাহতের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই কৌশল যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় ও পরাজয়ের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এখন শত্রুকে কোনো এলাকায় স্থায়ীভাবে অবস্থান গড়ে তুলতে না দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ; সাময়িকভাবে কোনো ভূখণ্ড দখল ঠেকানো নয়।
Author