
এক,
মানুষ দুনিয়াতে যে সম্পদ অর্জন করে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেইটা ভোগ করতে চায়। তারপর মৃত্যুর পরে তার নিজের সন্তানকে দিয়ে যেতে চায়। সন্তানের ভোগদখলের মধ্য দিয়ে সে অনন্তকাল নিজের ভোগদখলের ইচ্ছাকে কিছুটা বাস্তবায়ন করে। ইসলামী নীতি ও দর্শনে মানুষের জীবন, সম্পদ—সবই আল্লাহর। এই জন্য মানুষের সম্পদ অর্জন, ভোগ, বিতরণ—সবকিছু আল্লাহর দেওয়া সীমানার মধ্যে রাখা মুসলমানের কর্তব্য। কিন্তু এই সীমানার মধ্যে সম্পদের লিগ্যাল সেন্সে ব্যক্তি মালিকানা মানুষেরই। সম্পদের উপর ব্যক্তি মালিকানার উচ্ছেদ ইসলাম প্রেসক্রাইব করে নাই।
দুই,
কিন্তু সম্পদ অর্জন হইতে হবে হালাল পথে। সম্পদের ব্যয়ও হইতে হবে হালাল পথে। কোন হারাম কাজে কেউ তার নিজের অর্জিত সম্পদও ব্যয় করতে পারবে না। নিজের অর্জিত সম্পদ থেকে নিজের সন্তান, স্ত্রী এবং বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্বও পালন করতে হবে। এক বছরের সময় ধরে নিসাবের বেশি পরিমাণ সম্পদ থাকলে প্রতি বছর ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে। এই বাধ্যতামূলক যাকাতের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং সমাজের অপরাপর মানুষের মধ্যে যারা দরিদ্র, তাদের জন্য দান-সদকা করা ভালো কাজ। দানের মধ্যে দিয়ে মানুষের গুনাহ মাফ হয়, আল্লাহর রহমত আসে, মর্যাদা বাড়ে। এই নীতিমালার মধ্যে মানুষ তার সম্পদ জীবিত অবস্থায় তার নিজের পছন্দমতো খরচ করতে পারবে। সন্তানদের ভরণ-পোষণ করতে গিয়ে একজনের বিপরীতে আরেকজনকে ডিসক্রিমিনেশন করা বৈধ না। কিন্তু কতখানি সম্পদ দান-সদকা করতে পারবে—তার কোনো লিমিট দেওয়া নাই। দান-সদকা করার ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের ভরণ-পোষণ প্রথম প্রায়োরিটি, এরপর আত্মীয়স্বজন, এর পর সমাজের অপরাপর মানুষ। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে দরিদ্র লোক না থাকলে সমাজে অন্যান্য দরিদ্র মানুষ প্রায়োরিটি পাবে।
তিন,
কিন্তু মৃত্যুর পরে তার সম্পদ কিভাবে বণ্টন হবে, সেই স্বাধীনতা কোনো মুসলমানের নিজের হাতে নাই। এই বণ্টনের নিয়ম আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিছেন। আল্লাহর আইনে মানুষের মৃত্যুর পর তার সম্পদ তার সন্তান, স্ত্রী আর বাবা-মা পাবে। এইটা প্রথম প্রায়োরিটি। এর পরের ধাপে ভাই-বোন। কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে সম্পদ দ্বিতীয় ধাপে ভাই-বোন পাইতে পারে। মানুষের স্বাধীনতা আছে তার সম্পদের তিন ভাগের এক পর্যন্ত নিজের ইচ্ছায় কারো জন্য অসিয়ত করে যাওয়া। কিন্তু যারা উত্তরাধিকার আইনে সম্পদ পাবে, তাদের মধ্যে কারো জন্য এই অসিয়ত করা যাবে না।
চার,
ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে ছেলে সন্তান মেয়ে সন্তানের দ্বিগুণ সম্পদ পায়। যেহেতু ইসলামী আইনে পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সবসময় ছেলেদের উপর ন্যস্ত, সম্পদেও ছেলেদের প্রাপ্য বেশি। এইটা ইন্টার্নালি কন্সিসটেন্ট। ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে এই পার্থক্য শুধু জেন্ডারের কারণে না। বরং অর্থনৈতিক দায়িত্বের পার্থক্যের কারণে। যদি শুধু জেন্ডারের কারণে হইত, তাহলে সন্তানের সম্পদে বাবা-মা দুইজনেই ছয় ভাগের এক ভাগ করে সমান সমান পাইতেন না। একজন আরেকজনের অর্ধেক পাইতেন। কারো যদি এক ছেলে থাকে, তাহলে সে পুরো সম্পত্তিই পাবে (বাবা-মা-স্ত্রীর অংশের পরে)। কিন্তু কারো যদি এক মেয়ে থাকে, তাহলে সে সম্পত্তির অর্ধেক পাবে। দুই মেয়ে থাকলে তারা একসাথে তিন ভাগের দুই ভাগ। বাকি সম্পত্তি বাবা-মা-স্ত্রী পাবে। বাবা বেশি পাবে। যদি বাবা জীবিত না থাকেন, তাহলে ভাই-বোনরা সম্পত্তির বাকি অংশ পাবে। কোনো ভাই যদি তার প্রাপ্য ভাগ থেকে বোনকে সমান সমান সম্পদ দিতে চায়, ইসলামের তাতে কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু ছেলে সন্তানের কনসেন্ট ছাড়া মেয়ে সন্তানকে বাবা সমান সমান অসিয়ত করে যাইতে পারবেন না। যদি কোনো বিশেষ প্রয়োজন থাকে, যেমন এক সন্তান অসুস্থ অথবা অতিরিক্ত দরিদ্র, তাহলে জীবিত অবস্থায় মালিকানা হস্তান্তর করে কম-বেশি দিয়ে যেতে পারবেন, ছেলেকেও, মেয়েকেও।
পাঁচ,
নিজের কষ্ট করে অর্জন করা সম্পত্তি নিজের মেয়ে সন্তানের পরিবর্তে ভাই-বোনরা পাবে—এইটা আধুনিক মাইন্ডে এক বিশাল কন্ট্রাডিকশান তৈরি করে। কিন্তু ইসলাম যে জীবনবোধ তৈরি করে, সেইখানে সম্পদ কুক্ষিগত করে ভোগ করার চাইতে নিজের আত্মীয়স্বজন আর সমাজের দরিদ্র মানুষের মধ্যে দান-সদকা-ওয়াকফ করা অধিক ভালো কাজ। সূরা নিসায় আল্লাহ উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনের সময় হাজির হওয়া আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম আর মিসকিনদেরকেও কিছুটা সম্পদ দিতে বলছেন। সম্পদের তিন ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত উত্তরাধিকারের বাইরে অসিয়াত করে যাওয়া বৈধ। যার সম্পদের পরিমাণ সমাজের অ্যাভারেজের চাইতে অনেক বেশি আর সন্তান-সন্ততি কম, তার জন্য এই তিন ভাগের এক ভাগ অসিয়ত করে যাওয়াই মুস্তাহাব। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর সময় যদি স্ত্রী এবং একজন ছেলে সন্তান থাকে, বাবা-মা না থাকে, আর যদি তিনি তিন ভাগের এক ভাগ ভাই-বোন এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের জন্য অসিয়ত করে যান, তাহলে তার ছেলে সন্তান পাবে ৫৮%। আর তার যদি ছেলের পরিবর্তে এক মেয়ে সন্তান থাকে, এবং তিনি কোনো অংশ অসিয়ত করে না যান, তাহলে মেয়ে সন্তান পাবে ৫০% আর ৩৭.৫% যাবে ভাই-বোনদের কাছে।
কাজেই, ছেলে সন্তান আর মেয়ে সন্তানের মধ্যে যদি সমতাও চান, সবটা মেয়ে সন্তানকে লিখে দেওয়ার পরিবর্তে ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে তিন ভাগের এক ভাগ অসিয়ত করে অন্যদের দেওয়ার অভ্যাস করাটাও একটা ভালো সমাধান। শুধু নিজের সন্তানই আমার সন্তান আর ভাই-বোনের সন্তান অনেক দূরের—এই চরম ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক ওয়ার্ল্ডভিউ একমাত্র ওয়ার্ল্ডভিউ না। বরং আজকের যুগে যেইখানে মানুষের সন্তান একটা-দুইটা, সেই ক্ষেত্রে ভাই-বোনদের সন্তানকেও ওউন করাই বেটার মডেল। তাদের বড় হওয়া, প্রয়োজন—সবকিছুতে কাছে থাকেন। আপনার সম্পদের একটা অংশ তাদেরকেও অসিয়ত করে যান। আপনার ছেলে থাকলে এই অসিয়ত আপনার করতে হবে, মেয়ে থাকলে তারা এমনিতেই পাবে।
সব সম্পদ নিয়ে মানুষ কবরে যায় না। ভাই-বোন মানুষের কাছের মানুষই। একা একা ভালো থাকার চাইতে সবাইকে নিয়ে একসাথে ভালো থাকাই বেটার মডেল। যে সন্তান আপনার না, কিন্তু মানুষেরই, তার জন্যও আপনার সামর্থ্য উন্মুক্ত করে দেওয়া ভালো কাজ। এই কাজের বিনিময়ে আপনার নিজের এবং আপনার সন্তানের জন্য আল্লাহ রহমতের দরজা খুলে দিবেন।
(হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ড. মির্জা গালিবেল ফেইসবুক ওয়ালে লেখাটি পলিসি পেপারের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।)

Author