
ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ভার পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল—একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনবান্ধব প্রশাসন এবং সর্বোপরি এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও গণরায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো হবে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ যেমন হওয়ার কথা ছিল, গত ছয় মাসে তার বিন্দুমাত্র পরিবেশও শাসক শ্রেণি তৈরি করতে পারেনি। বরং নানা কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যে মনে হচ্ছে, জনগণের প্রত্যাশা এবং গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মানুষ রাজপথে নেমেছিল, যে গণরায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন কোথায়?
নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। তারপরও নির্বাচনের ফলাফল এবং গণভোটের ফলাফলকে পাশাপাশি রেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা পাওয়া যায়।
প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোটার বিএনপির পক্ষে রায় দিয়ে তাদের সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ জনগণের একটি বড় অংশ একদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবগুলোর পক্ষে মত দিয়েছে, অন্যদিকে সেই সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্বও বর্তমান সরকারকে দিয়েছে। এই দুই রায়ের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে—জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে এবং সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারকে তথা বিএনপিকে দিয়েছে।
দুঃখজনক হলো, নির্বাচন-পরবর্তী মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই সেই জনআস্থার ওপর ছাই নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
রাষ্ট্র কাঠামোর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বাস্তবায়নে ধীরগতি বা ব্যর্থতা যেমন হতাশাজনক, তেমনি জনজীবনের সংকটও এখন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, তীব্র লোডশেডিং, বাসাবাড়ি, পাম্প ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট—সব মিলিয়ে নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। কোথাও পরিবহন সংকটে, কোথাও উৎপাদন ব্যাহত, কোথাও শিল্পকারখানা কার্যত স্থবির।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য হওয়া উচিত আরও সংবেদনশীল, পরিমিত ও দায়িত্বশীল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মন্ত্রীদের পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক সচিব ও কর্তাদের বেফাঁস মন্তব্যও জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন—কয়টি কারখানা বন্ধ হয়েছে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু ‘কারখানা বন্ধ’ বলতে কি শুধু কোনো উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে ফ্যাক্টরির তালা ঝুলিয়ে দেওয়াকেই বোঝাবে? শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন বন্ধ থাকা, শ্রমিকদের কর্মহীন সময় কাটানো, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং কারখানাগুলো উৎপাদনক্ষমতার নিচে চলে যাওয়াও কি সংকটের অংশ নয়?
কারখানার দরজায় তালা না ঝুললেও যদি উৎপাদন বন্ধ থাকে, শ্রমিক কাজ না পান, উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে যেতে না পারেন—তাহলে সেটিকে সুস্থ শিল্পপরিবেশ বলা যায় কীভাবে?
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও জনগণকে স্বস্তি দিতে পারছে না। প্রতিনিয়ত ছিনতাই, চুরি, সংঘাতের খবর আসছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজনৈতিক হানাহানি ও সংঘাতও জনমনে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করছে। অথচ এসব মৌলিক সমস্যার কার্যকর সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাল্টাপাল্টি যেন বেশি দৃশ্যমান।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বশীল মন্ত্রী বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দুই বছর সময় লাগতে পারে। ধরে নিলাম, বাস্তবতার কারণে সত্যিই দুই বছর সময় প্রয়োজন। সংকট সমাধানে সময় লাগতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দুই বছর দেশের অর্থনীতি কীভাবে চলবে? শিল্প উদ্যোক্তারা কীভাবে উৎপাদন করবেন? শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কীভাবে নিশ্চিত হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কি এমন একটি দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যেখানে বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ মৌলিক উৎপাদন অবকাঠামোর সংকট কাটাতে আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে?
বিনিয়োগ শুধু নীতির ওপর নির্ভর করে না; বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন আস্থা, স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা। দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ না পায়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ক্রয়াদেশ ধরে রাখতে না পারে, তাহলে
নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কীভাবে?
সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তাই কথাবার্তায় আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি বক্তব্য কখনো কখনো বাজারে, শিল্পখাতে এবং সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের ‘বেফাঁস মন্তব্য’ করার সুযোগ নেই। জনগণ এখন আশ্বাসের চেয়ে সমাধান দেখতে চায়।
মানুষ জানতে চায়—সংকট সমাধানে সরকারের পরিকল্পনা কী? কত দিনে কী করা হবে? জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা কোথায়? শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি কোথায়?
সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—সমস্যাকে অস্বীকার না করে সমস্যার গভীরে যাওয়া এবং দ্রুত বাস্তবসম্মত কর্মপন্থা হাতে নেওয়া। শুধু ‘সময় লাগবে’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সময়ের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই সময়ের প্রতিটি ধাপে জনগণকে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ যদি বর্তমান সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে সেই আস্থার যথাযথ মর্যাদা দেওয়া সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। একইভাবে গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটিও কোনো রাজনৈতিক সুবিধামতো উপেক্ষা করার বিষয় নয়।
রাষ্ট্রের পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়; পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটবে। বাজারে স্বস্তি ফিরবে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়বে, শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে, বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে।
মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা ফলাফল দেখতে চায়। গণরায়ের মর্যাদা রক্ষা এবং জনআস্থা ধরে রাখার একমাত্র পথ হলো—কথার চেয়ে কাজে অগ্রাধিকার দেওয়া, সংকটকে স্বীকার করে দ্রুতদৃশ্যমান সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া।
দুঃখজনকভাবে জাতীয় এই সংকটের সময়ে মিডিয়া, টকশো থেকে রাজপথ—সবখানেই অযাচিত ও অর্বাচীন কথাবার্তায় পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। কে কার ছাত্র, কে কার চেয়ে যোগ্য, কে কাকে ছাড়িয়ে গেল—এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক যেন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
একটি সংকটময় সময়ে সরকারের আচরণ হওয়া উচিত ছিল অভিভাবকের মতো। কিন্তু ইগোর রাজনীতি ও আত্মতুষ্টির আবরণে সরকার সেই অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বরং সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের রাজপথ ও ক্যাম্পাস দখলের শোডাউন এবং সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তির তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে।
কেউ কেউ যেন নিজেদেরকে সরকারের সবচেয়ে একনিষ্ঠ অনুগত প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। অথচ সরকারের প্রতি আনুগত্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হওয়া উচিত—জনগণের সংকটকে নিজের সংকট হিসেবে দেখা। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা নয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিরোধী দল যখন জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রতিবাদ ও আন্দোলন করছে, তখন সেটিকে যদি সরকার এমনভাবে দেখে যে এর আড়ালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে সেটিও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু এমন আশঙ্কা থাকলেও সমাধানের পথ রাজপথে শক্তি প্রদর্শন নয়।
সমাধানের পথ হতে পারে—আলোচনা।
সরকার চাইলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক টেবিলে বসতে পারে। জ্বালানি সংকট উত্তরণে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি, জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে জাতীয় সংলাপ হতে পারে। সংকটকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সুযোগ হিসেবে না দেখে জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করাই হবে পরিণত রাজনীতির পরিচয়।
অন্যথায়, জাতীয় সংকট থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে, রাষ্ট্রের পরিস্থিতি হবে অস্থিতিশীল। জাতীয় সংকট থেকে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, আর সেই অস্থিরতা যদি ক্রমেই রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতার দিকে গড়ায়, তাহলে তার দায় কোনো একক পক্ষ এড়িয়ে যেতে পারবে না। তাই এখন প্রয়োজন কে কাকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করবে—সেই প্রতিযোগিতা নয়; বরং কীভাবে জাতীয় সংকট মোকাবিলা করে দেশকে স্থিতিশীল রাখা যায়, সেই বিষয়ে একটি সর্বদলীয় ও জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা।
যখন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে—কে কার ছাত্র হওয়ার যোগ্য, কে কাকে ছাড়িয়ে গেল—তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংকটগুলো নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?
অবশ্য শুধু সরকার নয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। জাতীয় সংকটকে কেন্দ্র করে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক রাজনীতি করা দরকার। প্রতিটি সংকটকে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মঞ্চ বানানো যেমন সমাধান নয়, তেমনি সরকারেরও প্রতিটি প্রতিবাদকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। জনগণের দুর্ভোগকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত না করে সমাধানের দাবিতে পরিণত করতে হবে।
সরকারের প্রতি আহ্বান—ইগো নয়, অভিভাবকসুলভ আচরণ করুন। বয়ান নয়, কর্মপরিকল্পনা দিন। শোডাউন নয়, সংলাপ করুন। দায় এড়িয়ে সময় চাইবেন না; বরং সময়কে কাজে লাগিয়ে দৃশ্যমান ফলাফল দিন।
কারণ জনগণ অতীতের মতো আর নতুন কোনো রাজনৈতিক বয়ান শুনতে চায় না। তারা চায় নিরাপদ জীবন, সুলভ বাজার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস, সচল শিল্প, কর্মসংস্থান এবং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র। কারণ জনগণ আর কারও রাজনৈতিক ইগোর কাছে তাদের ন্যায্য অধিকার বন্ধক রাখতে রাজি নয়।
(লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি পর্যবেক্ষক, fajlayminhaz@gmail.com
01673524669 (WhatsApp)
Author